• বাংলা ডেস্ক
  • ১০ জুন ২০১৯ ১৩:৪১:১৭
  • ১০ জুন ২০১৯ ১৫:১২:২৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

দুদক পরিচালককে ঘুষ দেওয়ার অডিও ফাঁস করলেন ডিআইজি মিজান

খন্দকার এনামুল বাসির ও মিজানুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত

নারী নির্যাতনের অভিযোগে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার হওয়া পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু এই তদন্ত করতে গিয়ে দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসির ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মিজানুর রহমান।

মাস ছয়েক ধরে দুজনের মধ্যে এ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথমে ২৫ লাখ ও পরে ১৫ লাখ টাকা দিয়েছেন মিজানুর। কিন্তু ২ জুন খন্দকার এনামুল বাসির মিজানুরকে জানান, তিনি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারের চাপে তাকে অব্যাহতি দিতে পারেননি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মিজানুর টাকাপয়সা লেনদেনের সব কথা ফাঁস করে দেন। প্রমাণ হিসেবে হাজির করেন এনামুল বাসিরের সঙ্গে কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ড। এ বিষয়ে রবিবার প্রতিবেদন প্রচার করে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন নিউজ।

তবে এনামুল বাসির ঘুষ নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, অডিও রেকর্ডটি বানোয়াট। তিনি টাকাপয়সা নেননি। তিনি গত মাসের শেষ দিকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন এবং মিজানুরের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছেন।

অন্যদিকে মিজানুর রহমান বলেছেন, তিনি খন্দকার এনামুল বাসিরকে একটা স্যামসাং ফোন কিনে দিয়েছিলেন শুধু তার সঙ্গে কথা বলার জন্য। তার গাড়িচালক হৃদয়ের নামে সিমটি তোলা। এতে দুজনের কথা ও খুদে বার্তা বিনিময় হয়েছে।

ডিআইজি মিজানুর ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত জানুয়ারির শুরুর দিকে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। বিয়ে গোপন করতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারকে গ্রেপ্তার করানোর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। তখন তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। মিজানুরের বিরুদ্ধে এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে। গত বছরের ৩ মে অবৈধ সম্পদসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে মিজানুরকে দুদক কার্যালয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মিজানুর রহমান ও তার প্রথম স্ত্রী সোহেলিয়া আনারের আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। মিজানুরের নামে ৪৬ লাখ ৩২ হাজার ১৯১ টাকা এবং স্ত্রীর নামে ৭২ লাখ ৯০ হাজার ৯৫২ টাকার অসংগতিপূর্ণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের খোঁজ পাওয়ার কথা দুদকের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তদন্ত শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায় দুদক পরিচালকের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার এই অভিযোগ পাওয়া গেল।

মিজানুর রহমান বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রথমে তদন্ত করছিলেন দুদকের উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। পরে তদন্তের দায়িত্ব নেন পরিচালক এনামুল বাসির। তিনি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তার কাছে ২৮ বছরের বেতনের রসিদ ও জাতিসংঘ মিশন থেকে আয়ের কাগজপত্র চান। মিজানুর দুদক কার্যালয়ে তার সঙ্গে দেখা করে সব কাগজপত্র দিয়ে আসেন। এনামুল বাসির তাকে একটি টিঅ্যান্ডটি নম্বর দিয়ে কথা বলতে বলেন। মিজানুর ফোন করলে এনামুল বাসির তার সঙ্গে রমনা পার্কে দেখা করতে বলেন। মিজানুর ১১ জানুয়ারি দেখা করতে যান। এনামুল তাকে বলেন, তার ফাইলে যে কাগজপত্র আছে, তাতে মিজানুরকে ধরার কোনো উপায় নেই। কিন্তু টাকাপয়সা ছাড়া তিনি মিজানুরের পক্ষে প্রতিবেদন দিতে পারবেন না। তিনি শুরুতে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে ৪০ লাখ টাকায় রফা হয়।

মিজানুর বলেন, ‘আমি তাকে করজোড়ে বলি, আপনি আমার ভাই। আপনার হাত ধরি-পা ধরি, আপনি আমাকে বাঁচান। এরপর ১৫ জানুয়ারি রমনা পার্কে গিয়ে তাকে ২৫ লাখ টাকা দিই।’ তার গাড়িচালক ও সরকারি দেহরক্ষী ব্যক্তিগত গাড়িতে করে টাকাসহ এনামুলকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সামনে তার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসেন বলে দাবি করেন মিজানুর। বাকি টাকার জন্য চাপ দিতে শুরু করলে তিনি আবারও রমনায় ৩০ জানুয়ারি দেখা করতে যান এনামুল বাসিরের সঙ্গে। দিন সাতেক পর তিনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রমনা পার্ক-সংলগ্ন ফটকের কাছে দুদক পরিচালককে ১৫ লাখ টাকা দেন।

ঘুষের টাকা দেওয়ার পর মিজানুর তদন্ত প্রতিবেদন তার পক্ষে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। ২ জুন এনামুল বাসির তার সঙ্গে পুলিশ প্লাজায় মিজানুরের স্ত্রীর দোকানে দেখা করতে গিয়ে জানান, কাজটা তিনি করতে পারেননি।

এ ব্যাপারে এনামুল বাসির বলেছেন, মিজানুরের স্ত্রীর বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আমি দোকানে গিয়েছিলাম।

খন্দকার এনামুল বাসির ও মিজানুর রহমানের মধ্যে হওয়া প্রথম রেকর্ড :

ডিআইজি মিজান : ...আপনার জন্য কিছু বই এনেছি, এগুলোয় আইনের বইটই আছে।

এনামুল বাছির :...নিয়া আছেন টাকা.. কোন ফর্মে আনছেন?...বাজারের ব্যাগে... না...

ডিআইজি মিজান : ... বাজারের ব্যাগে।

এনামুল বাছির :... এগুলা কি...

ডিআইজি মিজান :... বই আছে এতে।

এনামুল বাছির : ... কী বই?

ডিআইজি মিজান :...আইনের বইটই আছে...আমি আজকে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আইনের বই কিনলাম...।

এনামু বাছির :... ও

ডিআইজি মিজান :... বড় ভলিউম না, এই টুয়েন্টি ফাইভতো...তেমন বড় ভলিউম না, সব এক হাজার টাকার নোট।

এনামুল বাছির :... আচ্ছা।

দ্বিতীয় রেকর্ড :

ডিআইডি মিজান :... কমিশন আমাকে হ্যারেস করছে।

এনামুল বাছির :... জি ইনকোয়ারি রিপোর্ট আমি দেখেছি... এটা একটা ভুয়া রিপোর্ট। আইওর রিপোর্ট আমি চাইলে কমিশনে দিতে পারি। আমি দিলে অফিসে কোনো কোশ্চেন হয় না। উনারাও (কমিশন) বুঝতেছে আপনাকে ধরা যাবে না।

ডিআইজি মিজান : ...জি ধরা যাবে না।

এনামুল বাছির : ...আমি আপনার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ চাই। এটা হইলো কথা। বাকিগুলো হইলো...

ডিআআইজি মিজান : ...না না শুনেন আর ২৫ লাখ টাকা আমাকে নেক্সট ৮-১০ দিন সময় দিলে আমি ম্যানেজ করে ফেলব।

এনামুল বাছির : ...এত সময় দেওয়া যাবে না, আগামী সপ্তায়...

ডিআইজি মিজান : আচ্ছা

এনামুল বাছির : ...আর হইলো কি, আমার ছেলেটা উইলসে পড়ে...

ডিআইজি মিজান : ...উইলসে পড়ে?

এনামুল বাছির : ওরে আনা-নেওয়ার জন্য একটা গাড়ি...

ডিআইজি মিজান : ...গ্যাসের গাড়ি?

এনামুল বাছির : ...সকাল ৯টায় স্কুলে দিবে আর দুপুর ১২টায় বাসায় পৌঁছে দিবে, এটাই আমার চাহিদা আর কোনো চাহিদা নাই।

অপর একটি অডিও রেকর্ডে এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানের মধ্যে বেনামে হিসাব খোলা ও বাহক চেক মারফত টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়।

এনামুল বাছির : ...এমন একটা অ্যাকাউন্টে রাখা দরকার যেখানে আমি বাট আই কেন অপারেট হেয়ার। এটা মোটামুটি একটা পারমান্যান্ট অ্যাকাউন্ট যেটা আমি...। কারণ আপনার মতো আরও কেউ তো আসতে পারে।

ডিআইজি মিজান :... জি

এনামুল বাছির :...আমি বলতে চাইছি সেটা না, আপনার মতো যদি এ রকম চিপার মধ্যে পড়ি, তখনতো আরেকজনের কাছ থেকেও আমার নিতে হবে।

ডিআইজি মিজান :... হা-হা-হা

এনামুল বাছির :... চেকটা আমি সই করলাম

ডিআইজি মিজান :...হ্যাঁ, হ্যাঁ

এনামুল বাছির :... ইন আদার নেইম, দিয়ে আমি চেকটা সই করলাম, মনে করেন এটা ফেইক অ্যাকাউন্ট, ফেইক পারসনের হতে হবে।

ডিআইজি মিজান :... আপনার নাম লিখে দিলে হবে

এনামুল বাছির :... আমার নামতো লেখাই যাবে না

ডিআইজি মিজান :... কার নাম থাকবে তাহলে?

এনামুল বাছির :... ব্ল্যাঙ্ক থাকবে

ডিআইজি মিজান :... ওকে ওকে...ব্ল্যাঙ্ক

এনামুল বাছির :... যার নামই থাকবে বেয়ারার গিয়ে নিয়ে আসবে অ্যাকাউন্ট থেকে।

তৃতীয় অডিও রেকর্ড :

ডিআইজি মিজান :... মামলা কেন হবে? আপনি তো বললেন....

এনামুল বাছির : ...আপনি একটা জিনিস বোঝেন! আমি কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে রিপোর্ট দিছি। কোনো মিডিয়ায় কি কোনো কথা আসছে? আপনি যদি চান ওসব (ঘুষের টাকা) ফেরত নিতে পারেন।

ডিআইজি মিজান :... দরকার নাই

এনামুল বাছির : ... আমি যখন চেয়ারম্যানকে বললাম, চেয়ারম্যান মানে পারে...তো আমাকে মেরেই ফেলবে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘ঘুষ দেওয়া-নেওয়া দুটোই অপরাধ। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্যি হলে উভয়ের বিরুদ্ধে মামলা হতে হবে এবং তদন্তকালীন আইন অনুযায়ী তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় দুদকের ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন হয়। তাই দুদকের স্বার্থেই দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত হওয়া খুবই জরুরি।’

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0190 seconds.