• ০১ জুন ২০১৯ ২১:২৩:৪৩
  • ০১ জুন ২০১৯ ২১:২৩:৪৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

সাংবাদিকতার হালচাল :গণআয়নায় ভাসে কার মুখ?

প্রতীকী ছবি

মধ্য রাত অলিগলি পেরিয়ে ফ্লাইওভারের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন এক বয়স্ক লোক। পেশায় শিক্ষক। আর শিক্ষক মানেই সমাজে তার একটা আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। বিশ্বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে এখনো শিক্ষকরা অন্যসব পেশার চেয়ে এগিয়ে। ভারত উপমহাদেশে তো রীতিমতো শিক্ষক/ গুরুদের দেবতা জ্ঞান করা হয়।

সেই বিশ্বাসযোগ্য-পূজনীয় শিক্ষক যখন সিঁড়িটা ভেঙে ফ্লাইওভারে দাঁড়ালেন বাড়ি ফেরার গাড়ি ধরার অপেক্ষায়, ঠিক তখন তার সামনে এসে থুবড়ে পড়লো এক নারী শরীর। শাড়িতে প্যাচানো নারী শরীরটায় তখনো দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। অনেক কষ্টে কোনো মতে আগুন নেভালেন শিক্ষক। এবার মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ নারীকে হাসপাতালে নেয়ার পালা। কিন্তু এই অবস্থা দেখে কোনো গাড়ি থামাচ্ছে না।

অনেক চেষ্টার পর একটা ট্যাক্সি থামলো। ট্যাক্সিওয়ালা আর শিক্ষক মহোদয় মুমুর্ষূ নারী শরীরটাকে টেনে তুললেন গাড়িতে। এরপর সোজা হাসপাতাল। সারারাত হাসপাতালে কাটিয়ে শিক্ষক বাড়ি ফিরলেন কিন্তু মেয়েটাকে বাঁচানো গেলো না। 

মেয়েটাকে বাঁচাতে না পারার দায়ে নিজেকে অপরাধী করে যখন শিক্ষক সোফায় বসে অনুতাপে ভুগছেন, তখন দরজায় টোকা পড়লো। কে? প্রশ্ন করতে দেরি কিন্তু উত্তর আসতে দেরি হলো না ‘থানা থেকে আসছি’। থানা থেকে যারা আসেন তারা যে কী দশা করে ছাড়েন, সে কথা আর কেউ না জানলেও ভারত উপমহাদেশের লোক ঢের জানে। ওই নারীর গায়ে কে বা কারা আগুন ঢাললো সে আলোচনায় না গিয়ে, পুলিশ টানাটানি শুরু করলো মাস্টার মশাইয়ের চরিত্র নিয়ে।

পুলিশের দেখানো পথে মাস্টারের বাড়িতে হাজির সমাজের দর্পণ হিসেবে খ্যাত গণমাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিকেরা। পুলিশি জেরায় বিপর্যস্ত মাস্টারকে এবার জোঁকের মতো জেঁকে ধরলেন সংবাদকর্মীরা। তারাও সঙ্গত-প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন না করে, পুলিশি ঢঙে মাস্টারের চরিত্রের আঁকা বাঁকা পথ ধরেই আগাতে লাগলেন। যেমন ধরুন, ‘এতো রাতে আপনি ফ্লাইওভারে কী করছিলেন?’ ‘মেয়েটি কী আপনার পূর্ব পরিচিত?’ ‘যাকে চেনেন না তাকে বাঁচাতে গেলেন কেনো’ ‘মেয়েটির সাথে আপনার কোনো গোপন সম্পর্ক ছিলো কি?’ এমন অনেক প্রশ্নে নাকাল মাস্টার শেষ পর্যন্ত ঘর থেকেই বের হওয়া বন্ধ করে দিলেন। চাপ সামলাতে পরিবারের লোকজনও এড়িয়ে চলতে শুরু করলো প্রতিবেশীদের।

তিনদিন না গড়াতেই মূলধারার সব সংবাদমাধ্যম বড়ো অক্ষরে ছেপে দিলো ‘পরকীয়ার বলি সেই অগ্নিদগ্ধ মেয়েটি’ ‘খুনের নেপথ্যে কি তবে মাস্টার মশাই?’‘মাস্টার মশাইয়ের চোখ কপালে তোলা যৌন জীবন’ আরো অনেক এমন খুচরো শিরোনাম। তবে সব সাংবাদিক-সংবাদমাধ্যম যখন স্রোতে ভাসছে। রাত বারোটা, ফ্লাইওভারে চল্লিশ পেরুনো প্রফেসর ও পঁচিশ পেরুনো নারী; সব কাচামাল মিলিয়ে যখন তৈরি হচ্ছে একের পর এক রসালো গল্প। তখন বেঁকে বসলেন এক নারী সংবাদকর্মী। তার বস বাকিদের মতো স্রোতে ভাসা কাভারেজ দিয়ে কাটতি বাড়াতে চাইলেও তিনি বললেন, ‘না। ব্যাপারটা অন্যরকম, আমি ঘটনার আরো গভীরে গিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই।’ নাছোড়বান্দা বস তার কথা মানতে নারাজ। অগ্যতা চাকরিই ছেড়ে দিলেন ওই নারী সাংবাদিক।

পরে অনেক অনুসন্ধানের পর, সামনে এলো আসল সত্যটা। আগুনে পুড়ে কাতরে মরা মেয়েটিকে প্রফেসর মারেননি, তার সাথে প্রফেসরের কোনো সম্পর্কও ছিলো না, এমনকি সে রাতের আগে মেয়েটিকে চিনতেনও না প্রফেসর। তবে ততদিনে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে, উপর্যুপুরি হেনস্তার শিকার প্রফেসরের মরণ দশা। নাকানিচুবানি খেতে খেতে প্রফেসরের পরিবারের হালও বেহাল। এ অবস্থায় যে কেউ অনায়াসে আত্মহত্যা করতে পারতেন, এমনকি সে আত্মহত্যা হতে পারতো একটি পারিবারিক আয়োজনও।

উপরের কাহিনীটা আপাতত সত্য নয়, কলকাতার একটা মেইনস্ট্রিম সিনেমার গল্প। তবে গল্পটাকে মিথ্যে বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগও নেই। এমনটা অহরহ বঙ্গদেশেও ঘটে, ঘটে ভারতেও; আমেরিকায়ও যে ঘটে না সেটা হলফ করে বলার উপায় নেই। দেশে-বিদেশের নানা খবরেই আমরা নানা সময়ে দেখি, ‘ভুল বিচারে ৩০ বছর জেলে কাটলো অমুকের’। বিদেশ মানে উন্নত দেশ হলে এই লাইনটার সাথে আরেকটা ছোটো লাইন যুক্ত হয়, তাতে বিষয়টা দাঁড়ায় ‘ভুল বিচারে ৩০ বছর জেলে, ৫০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ’।

বঙ্গ দেশে ভুল মামলায় অহেতুক সাজা পাওয়া জাহালমরা ছাড়া পেলেই ভাবেন, ‘যা বাঁচলুম, আল্লাহর অশেষ রহমত তাই আবার বাইরে আলো-বাতাসের দেখা পেলুম।’ ক্ষতিপূরণ তো অনেক দূরের আলাপ। আর বিদেশে গরু মেরে জুতা দেয়া হয় তবুও। কিন্তু তাতে লাভ কী? জীবন থেকে ত্রিশ বছর হারিয়ে যাওয়ার পর একটা মানুষকে তিন হাজার কোটি টাকা দিলেই বা কী জুড়ায়? সময়ের দেনা কি আসলে টাকায় মেটে?

এবার বাংলাদেশের মূলধারার সাংবাদিকতার দিকে চোখ রাখা যাক। বিকল্প ধারাও যে খুব একটা ব্যতিক্রম, সেটা বলারও উপায় নেই। এমনকি এ দেশে বিকল্প কোনো সংবাদমাধ্যম আছে কিনা, সেটাও অনেক তর্ক সাপেক্ষ বিষয়। যাক সে আলাপ বাদ দিয়ে আসল প্রসঙ্গে ফিরি। যারা গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বা এই জাতীয় কোনো বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন। হোক সেটা স্নাতক, স্নাতোকত্তর কিংবা এক-দুই বছরের ডিপ্লোমা কোর্স। আবার যারা সাংবাদিকতা বিষয়ে টুকটাক খোঁজ-খবরও রাখেন তারাও জানেন এক্ষেত্রে দুইটি মোটা দাগের আলোচ্য বিষয় আছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যাকে নানা ঢঙে সাংবাদিকতার প্রাণও বলা হয়।

১. অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা :

তাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়েও কেবল আক্ষরিক অর্থ ভাঙিয়েই বলা যায়, এটা একটু খাটাখাটির বিষয়। আগে পিছে দুই লাইন জুড়ে মাঝখানে একটা বা দুটো বাইট/বক্তব্য জুড়ে দিলেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়ে যায় না। ঘটনার পেছনের ঘটনা তুলে আনতে হয় এই সাংবাদিকতায়। পুরো ঘটনাই পর্যবেক্ষণ করতে হয় ভিন্ন ভিন্ন এঙ্গেল থেকে। সাধারণ মানুষ যেমন কোনো ঘটনা পাঁচ মিনিট পর্যবেক্ষণ করেই রায় দিয়ে দেন। সাংবাদিকদের তেমনটিকরলে চলে না। এমনকি সাংবাদিকতার সূত্র-তত্ত্ব সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত রায় দেয়ার সুযোগই দেয়নি। তাই কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে গেলে, দরকার পড়ে পর্যাপ্ত প্রমাণের। নিজে কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে, তথ্য-উপাত্তের মালা গেঁথেই প্রমাণ করতে হয় ঘটনা আসলে এটা না, ঘটনা হলো এটা।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ব্যাপারটা আরো জটিল। সাংবাদিককে কুয়োয় নয়, ধীর-শান্ত ও ধৈর্য্যশীল মন নিয়ে নেমে পড়তে হয় অথৈ জলে, সাগরে। হাজার বার এলোমেলো অহেতুক শামুক কুড়ানোর পর তুলে আনতে হয় ‘মুক্তো ভরা’ মূল্যবান ঝিঁনুক। যে মুক্তো পূর্বের সব ধারণা উল্টেপাল্টে দেবে। সবার সামনে হাজির করবে আসল সত্যটাকে। এ জন্য কখনো সখনো শার্লক হোমস কিংবা ফেলুদার চেয়েও বেশি দুর্গম পথ পেরুতে হয়। শার্লক-ফেলুদা কোনো তথ্য আদালতের সামনে আইনি ভাষায় উপস্থিত করতে পারলেই মুক্ত, কিন্তু সাংবাদিক? তাকে প্রাপ্ত তথ্য সর্বসাধারণের বোঝার উপযোগী করে যেমন পরিবেশন করতে হয়, তেমন প্রয়োজনে সেই তথ্য নিয়ে হাজির হতে হয় আদালতের কাঠগড়ায়। একজন সাংবাদিকের অনুসন্ধান যেমন এক নির্দোষ ব্যক্তিকে সাক্ষাৎ ফাঁসি থেকে বাঁচাতে পারে, তেমন পারে প্রকৃত অপরাধীকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাতে।

২. বিশ্লেষণী সাংবাদিকতা :

এটা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মতো অতোটা ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা অর্থক্ষয়ী নয়, তবে সময় সাপেক্ষ। কোনো বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গেলে সাংবাদিকদের অনেক বিষয়ে ঘাটতে হয়। লাইব্রেরি থেকে সরকারি মহাফেজখানা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাদুঘরের সংরক্ষণাগার, সব জায়গায়ই ছুটতে হয়। নেট ঘাটতে হয়, পড়তে হয় নানা জার্নাল। এমনকি সাহিত্যও পড়তে হয় কখনো সখনো। যেতে হয় বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞের দোড়গোড়ায়। এভাবেই সব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ মিলিয়ে পাঠকের সামনে একটা নতুন জিনিস নিয়ে হাজির হয় বিশ্লেষণী সাংবাদিকতা। পরপর পাঁচটা ঘটনার তুলনা করে দেখা গেলো নতুন কিছু, যা খুবই চমকপ্রদ। এটা অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ইট চুন-সুরকি এক করে এক শক্ত ইমারত গড়ার কাজ। কারণ ইমারতের দেয়াল মজবুত না হলে যে তা বেশিদিন টেকে না। তেমন বিশ্লেষণ মজবুত না হলে পাঠকও সেটা ‘খায়’ না।

ডেজ ইভেন্ট বা দিনের খবর। আসলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আবাধ অনলাইনের যুগে ডেজ ইভেন্ট আর আলাদা কোনো দ্যোতনা তৈরি করে না। মোবাইলে আঙুল ঘষে শুয়ে শুয়েই মানুষ যে খবর পেয়ে যায়, সে খবরের জন্য কেনো মানুষ কষ্ট করে রিমোট চাপবে? পত্রিকার ক্ষেত্রে এ প্রশ্নটা আরো ভয়াবহ, যে যুগে এক মুঠোফোনে লাখো পত্রিকার অনলাইন ভার্সন পুরে পকেটে গুঁজে রাখা যায়। সেযুগে মানুষ কেনো কষ্ট করে কাগজ কিনে বাসায় আনবে দোকান থেকে কিংবা হকারের দিয়ে যাওয়া পত্রিকা উল্টে-পাল্টে দেখবে দুহাতের শক্তি ক্ষয় করে? সহজ উত্তর মানুষ দেখবে না। ডেজ ইভেন্টের জন্য সত্যিই মানুষ আর গণমাধ্যমে ঢুঁ মারে না। ঢুঁ মারে অন্য কিছুর আশায়। অন্য এক চোরাস্রোত এখনো মানুষকে টিভি পর্দা বা পত্রিকার পাতায় টেনে আনে। আর সে হলো অনুসন্ধান আর বিশ্লেষণ। মানুষ আসলে বুঝতে চায় গণমাধ্যম ঘটনাটা কোন দৃষ্টিকোন থেকে দেখছে, তার মত করেই, নাকি অন্যভাবে? তার দেখা আর গণমাধ্যমের দেখার তফাৎ কী? আদৌ সে দেখায় নতুন কিছু আছে? যে গণমাধ্যম মানুষকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান দিতে পারে, মানুষ হাজারো রকম মিডিয়া দুহাতে-পায়ে ঠেলেও সেই গণমাধ্যমে ভেড়ে। কাগজে ছোঁয়ায় আঙুল, রিমোট চাপে। আর আলাদা কিছু না দিতে পারলে, ন্যাড়ারা আজকাল বারবার বেলতলায় যায় না।

আমাদের দেশের সাংবাদিকতা আছে কোথায়? এবার ঝাপসা চোখগুলো কচলে একটু সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। অনুসন্ধানী আর বিশ্লেষণ দুটো জিনিস এ দেশে উধাও প্রায়। কালেভদ্রে চোখে পড়ে। কোথাও কেউ খুন হলে আমাদের গণমাধ্যম বিস্তারিত ঘটনায় যাওয়ার ঝুঁকি নেয় না এখন। পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর প্রেসনোট বা উপস্থিত বক্তব্যই তাদের প্রথম এবং শেষ ভরসা। এই ঘটনা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ক্রসফায়ার, গুম কিংবা জঙ্গি দমনের ক্ষেত্রে। মানে যে ঘটনাগুলোয় সরকার কিংবা সরকারি বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা বেশি থাকে। মাদক বিরোধী অভিযানেও আমরা একই চিত্র দেখেছি। ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ যতোগুলো মানুষ এই স্লোগানের বলি হয়েছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম কক্সবাজারের একরামুল হক। ২০১৮ সালে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছিলো সরকারের একটি বিশেষ বাহিনী। মাদকের নামে হত্যা করা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। এটা ছিলো সরকারি বাহিনীর যোগসাজশে কক্সবাজারের তখনকার এমপির ফায়দা হাসিল। শত্রু দমন। সব জেনেশুনেও আমাদের সাংবাদিকতা এ ঘটনার কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি। আসলে করতেই চায়নি। একরামের স্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে অডিও ক্লিপ সরবরাহ করার পর, সেই খবর মূলধারার গণমাধ্যমের হাতে পৌঁছাতেই লেগেছিলো দিন চারেক।এরপর ওই অডিও ক্লিপ ধরে একটু-আধটু অনুসন্ধান আগালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সব প্রমাণ থাকার পরও সাংবাদিকরা প্রতিবেদন লিখে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পারেনি খুনি এরাই। আকারে ইঙ্গিতে আহা উহু করেছে আরকি। তাও না হয় মেনে নেয়া গেলো, কথিত উপরমহলের চাপই তাদের বিশেষ কিছু করতে দেয়নি। তারা আসলে মনে প্রাণে চেয়েছিলেন কিছু একটা করতে।

আরেক স্পর্শকাতর বিষয় ধর্ষণ। এক্ষেত্রেও আমাদের সাংবাদিকতা মূল ঘটনায় না গিয়ে সুড়সুড়ি দেয়া খবর উৎপাদনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু আরো একবার ধর্ষিত হন খবরের শিরোনামে, ভেতরের বর্ণনায় অথবা টিভি পর্দায়। ধর্ষকের পরিচয় প্রকাশ না করে অনেক সংবাদমাধ্যম তো রীতিমতো ধর্ষিতের পরিচয় প্রকাশ করে বসে থাকে। এ ক্ষেত্রে অগ্রনায়কের ভূমিকায় অনলাইন পোর্টালগুলো। কোনো মতে শিরোনামে ‘উপর্যুপুরি ধর্ষণ’ ‘রাতভর ধর্ষণ’ ‘জঙ্গলে টেনে নিয়ে ধর্ষণ’ ‘পালাক্রমে ধর্ষণ’ ‘গণর্ধষণ’ এমন কিছু শব্দ জুড়ে দিতে পারলেই হিট বাড়ে।

ধর্ষকামী জনতার পরিমাণ তো বাস্তব জগতের চেয়ে ভার্চুয়ালে কম নয় বরং বেশি। আর সেই ফায়দা কাজে লাগিয়ে এমন সুড়সুড়ি দেয়া কন্টেন্ট তৈরি করে আমাদের সাংবাদিকরা, সংবাদমাধ্যম। এটা করতে গিয়ে তারা হয়ে ওঠেন অতিমাত্রায় অমানবিক। ধর্ষণের শিকার মানুষেরা যেমন আইন আদালত, নিজ পাড়া-মহল্লা পরিবার ও আত্মীয় মহলে হেনস্তার শিকার হন, তেমন লাঞ্ছিত হন সাংবাদিকতার কবলে পড়ে। ধর্ষকের আদ্যোপান্ত খুঁজে বের না করে, আমাদের সাংবাদিকরা নানা রকম অদৃশ্য কারণে খুঁজে বের করেন ধর্ষিতার দোষগুণ। পারলে তারাও ওই নারীকে চরিত্রহীন বলে প্রমাণ করে ছাড়বেন।

আবার যে দু-একটা ঘটনা সাংবাদিকরা সামনে নিয়ে আসেন তাও ভাসা ভাসা। এই আলোচনা নিয়ে সামনে আগাতে রূপপুর পরমাণু প্রকল্প কেলেঙ্কারির দিকে চোখ রাখা যাক। কোনো এক পত্রিকার সাংবাদিক বের করে আনলেন, রূপপুর প্রকল্পে পুকুরচুরি নয় সাগর চুরি হয়েছে। একটা বালিশের দামই প্রায় ছয় হাজার টাকা, সেই বালিশ উপরে তুলতে আবার খরচ সাতশো টাকার বেশি। খবরটি প্রকাশের পর হইচই পড়ে গেলো। এটা হয়ে গেলো ‘সাহসী’ সাংবাদিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু আসলে কী হলো? বালিশকাণ্ড নিয়ে মাতামাতি, দেশব্যাপী চিৎকারের পর টপ করে দুর্নীতির দায় ঘাড়ে চাপিয়ে সরিয়ে দেয়া হলো, রূপপুর প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমকে।

কিন্তু এই সাহসী সাংবাদিকতায়তেমন কিছুই হলো না আদতে। আমাদের দৌড় ওই মাসুদ পর্যন্ত। এ ঘটনায় যে শুধু মাসুদ নয়, আরো অনেক বড়ো মাথা জড়িত সেটা আমরা জানি কিন্তু বলতে পারি না। অথবা বলতে চাই না।আমাদের সাহসী সাংবাদিকতার দৌড়ের দৌরাত্ম্যটা- রূপপুরকাণ্ডই একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সংবাদের চোখ দিয়ে দেখলে এই রূপপুরকাণ্ডকে কোনোভাবেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলা যায় না। স্রেফ কয়েকটা নথি ঘেঁটে এমন একটা রিপোর্ট করে ফেলা যায়। যেটুকু সময় খরচ আর দৌড়াদৌড়ি ওই নথিটা হাতে পেতে। 

সব ক্ষেত্রেই আমাদের সাংবাদিকতা ওই মাসুদ পর্যন্ত গিয়ে থামে। মাসুদ নামক স্টপেজের পর আর আগায় না্ আমাদের সাংবাদিকতার গাড়ি। মাইক্রোফোন-ক্যামেরাও পৌঁছায় না ও তল্লাটে। যে পাড়ায় থাকেন ঈশ্বর। আর এটুকুতেই হাততালির তোড়ে ভেসে যান কথিত ‘সাহসী’ সাংবাদিক। বনানী অগ্নিকাণ্ডের পর নাইমকে আমাদের গণমাধ্যম ‘নায়ক/হিরো’ বানিয়েছিলো কেনো? কারণটা সবাই জানেন নিশ্চিত। ওই যে ফায়ার সার্ভিসের পানি সরবরাহের ফুটো হয়ে যাওয়া পাইপ চেপে ধরা। এই ছোটো কারণে কাউকে হিরো বানানো একমাত্র বঙ্গদেশেই সম্ভব। কারণ এদেশ অন্তত জলিলের দেশ। অসম্ভবকে সম্ভব করাই যার কাজ। এমন ঘটনায় যেকেউ সাহায্যে এগিয়ে আসবে সেইতো স্বাভাবিক। আমরা এতো অমানবিক হয়ে গেছি যে, একটা স্বাভাবিক ঘটনাকেও আমাদের কাছে মহৎ লাগে। মনে হয় বিশাল কিছু। ঠিক একই দশা আমাদের সাংবাদিকতার।

প্রেসরিলিজ ছেপে ছেপে আমরা এমন জায়গায় পৌঁছে গেছি যে, একটা গতানুগতিক সংবাদ প্রতিবেদনকেও আমাদের কাছে বিশাল মনে হয়। আমরা ঘটনার গভীরে ঢুকে, তুলে আনতে পারি না নিরেট সত্য। আমাদের সাংবাদিকতার কবলে পড়ে চরিত্রহীন হয়ে পড়েন নির্দোষ প্রফেসররা। এমনকি অনেককে ফাঁসিকাষ্ঠেও ঝুলতে হয়। রাজা-রানীর মুখ ছাড়া কিছুই পড়ে না চোখে বঙ্গ দেশের সমাজের দর্পণে। হিকি গেজেটের মতো এদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমই আমাদের শোনায় বাহারি পণ্য ও রাজতন্ত্র সমাচার।

লেখক ও সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

সাংবাদিকতা নাজমুল রানা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0235 seconds.