• ২২ মে ২০১৯ ০০:৪০:৩৪
  • ২২ মে ২০১৯ ০০:৪০:৩৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

একটি আসন হারানোও মোদির জন্য পরাজয়

নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত


শিবম ভিজ :


বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের বিশাল নির্বাচনযজ্ঞ রবিবার শেষ হয়েছে। এখন ফলাফলের জন্য রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে ভারতবাসী। কিন্তু বুথফেরত জরিপগুলো থেকে যা জানা যাচ্ছে তাকে একদম অবিশ্বাস্যই বলতে হবে। এই জরিপগুলো দেখলে মনে হবে লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সবগুলো আসনই নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে। অর্থাৎ বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট কোন আসনেই পরাজিত হবে না সবগুলোতেই তারা জয়ী হবে।

বুথফেরত জরিপের ফলাফল ২৩ মে প্রমাণিত হবে। যদিও এর আগের বছরগুলোতে বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ জরিপের ফলই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনে জরিপের ফলে বলা হয়েছিল, এনডিএ ক্ষমতায় আসছে কিন্তু বিজেপি যে এককভাবে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে সে ব্যাপারে তারা কোন ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেনি।

কোনো কোনো বুথফেরত জরিপে বলা হচ্ছে এনডিএ ২৭৭ থেকে ৩৫২টি আসন পাবে। এক্ষেত্রে বিজেপি এককভাবে ২২৭ থেকে ২৯১টি আসন পেতে পারে। কেবলমাত্র দুটি বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে বিজেপি ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়ে বেশি আসন পেতে পারে। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে বিজেপি ২৮২টি আসন পেয়েছিল।

বুথফেরত জরিপের এধরনের ফলাফল দেখে এখন প্রশ্ন করা যেতেই পারে, বিজেপি এবং তার জোট সঙ্গী কেন একটি আসনেও পরাজিত হবে? পরিস্থিতি যেভাবে বিজেপির অনুকূলে বর্ণনা করা হচ্ছে তাতে মনে হতেই পারে, ভারতীয় লোকসভার প্রতিটি আসনেই তাদের জয় পাওয়া উচিত।

এদিকে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি অগ্রিম ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, তারা ২০১৪ সালের চেয়ে তিনগুণ বেশি আসন অর্থাৎ ১৩২ টি আসন পেলেই খুশি। কংগ্রেসের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষক প্রবীণ চক্রবর্তী এই ঘোষণা দেন। এরপর মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের কমল নাথও একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটেছিল। সেসময় তারা মাত্র ৪৪টি আসন পেয়েছিল। সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে যে ২৭২টি আসনের প্রয়োজন তার অর্ধেকেরও কম আসন পেয়েছিল তারা।

এখন বিজেপির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসই যদি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে জানায়, তাদের নেতৃত্বে জোট সরকার গঠনের জন্য যে কয়টি আসন প্রয়োজন তা অর্জন করার জন্য তারা যথেষ্ট চেষ্টা করছে না, তাহলে বিজেপি এবং তার জোটসঙ্গীদের কেন একটি আসনেও পরাজিত হতে হবে?

এবারের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদিকে সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল বিরোধী দল উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছে। এমনকি তাদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও এই বিরোধী দলগুলো একত্রিত হয়ে জোটও গঠন করতে পারছে না।

জনগণ বিশ্বাস করবে এবং গ্রহণ করবে এমন কোনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও তারা দিতে পারেনি। এমনকি বেকারত্বের মত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়েও তারা উল্লেখযোগ্য কোন প্রচারণা চালাতে পারেনি।  

সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, বিরোধী দলগুলো এতোটাই দুর্বল যে তারা সুযোগ্য একজন নেতাও নির্বাচন করতে পারেনি।  ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনগণ গ্রহণ করবে এমন কাউকে তারা জনসম্মুখে উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এমনকি বিরোধী দলগুলো ২০১৯ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভেরও চেষ্টা করেনি। ২০১৪ সালে আম আদমি পার্টির আরবিন্দ কেজরিওয়াল বারাণসিতে অন্তত মোদির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। অথচ এবার বিরোধী দলগুলো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বারাণসিতে তারকা একজন প্রার্থীকেও দিতে পারেনি।

স্বাভাবিকভাবেই মোদি ধরেই নিয়েছেন তিনি অনায়াসেই এই আসনে জয় পেতে যাচ্ছেন। ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর তিনি বারাণসিতে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর জন্য একবারও যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। অবশ্য প্রিয়াংকা গান্ধী একবার জানিয়েছিলেন, তিনি নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে বারাণসিতে লড়াই করার চিন্তা ভাবনা করছেন। এরপর কংগ্রেস এই বিষয়ে আর কিছুই জানায়নি।

এদিকে সমাজবাদী পার্টিও মোদির বিরুদ্ধে লড়ার জন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ নেতা তো দূরে থাক কিছুটা কম শক্তিশালী স্থানীয় প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি। বারাণসিতে মোদিকে এভাবে ছাড় দেয়ার প্রতীকী একটি অর্থ খুঁজে নেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ  বিরোধী দলগুলো এভাবে সমগ্র ভারতেই মোদিকে ছাড় দিয়ে গেছে।

এক্সিস মাই ইন্ডিয়া নামে একটি জরিপে বলা হচ্ছে, লোকসভার ৫৪২ টি আসনের মধ্যে এনডিএ মাত্র ১৭৭টি আসনে পরাজিত হতে পারে। এই ১৭৭টি আসনের মানুষের বোধ হয় কোন সমস্যা আছে।  তারা রাহুল গান্ধীকে কিভাবে তাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আশা করে? অথবা তারা কি এমন কোন অস্থিতিশীল জোট সরকার চায় যা ভারতকে দুর্বল করে দেবে? তারা কি এমন একটি সরকার চায় যারা কোন শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করবে। অথচ নরেন্দ্র মোদির সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার যেকোন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দ্বিধা করেনি। এমনকি জনগণের অসুবিধার কথাও তারা চিন্তা করে দেখেনি। এক্ষেত্রে ১ হাজার এবং ৫০০ রুপির নোট বাতিলের কথা তুলে ধরা যেতে পারে।

তবে বিরোধী দলগুলোকেও দোষ দিয়ে লাভ নেই। অনেকেই প্রচারণার ক্ষেত্রে মোদিকে ওস্তাদ হিসেবে মানছেন। বিষয়টির সত্যতাও রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে গণমাধ্যমও নরেন্দ্র মোদির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। টিভি খুললেই কেবল মোদিকেই চোখে পড়বে। সর্বত্রই কেবল মোদির জয় জয়কার। এছাড়া নমো টিভির কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নামে বিজেপির অর্থায়নে পরিচালিত এই টিভিতে কেবল মোদির নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়ই প্রচার করা হতো। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ এবং বিভিন্ন পত্রিকা, বিলবোর্ড, বাস এবং ট্রেনের টিকেট সব জায়গায় কেবল মোদির নাম।

ফলে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি ভারতীয়দের মনে ভালোভাবেই গেঁথে দিতে পেরেছেন যে মোদি ছাড়া আর কেউ নেই। মোদি যেন সবাইকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলতে চান ১২১ কোটি জনসংখ্যার দেশে মোদি ছাড়া আর কেউ আছে?

ভাবতেই অবাক লাগে, মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে কিভাবে রেল চলাচল করতো, কিভাবে যুদ্ধে লড়াই করা হতো অথবা কিভাবেই বা রাস্তাঘাটগুলো তৈরি হয়েছিল। প্রচারণার মাধ্যমে মোদি এভাবেই জনগণকে ভাবতে বাধ্য করেছেন। ফলে মোদির দল কেন একটি আসনও হারাবে এটি ভেবেই যে কেউ বিস্মিত হতে পারেন।

অপরদিকে এক্সিস মাই ইন্ডিয়ার জরিপে যে ১৭৭টি আসনে এনডিএ হারবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে অনেকেই হয়তো ভেবে থাকবেন এসব আসনের প্রার্থীদের হয়তো মোদির জোটের চেয়ে বেশী অর্থ রয়েছে। যদিও বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে তো বটেই এমনকি নির্বাচনী ব্যয়েও মোদি বিরোধীদের ছাড়িয়ে গেছেন। এক্ষেত্রেও তার জয় জয়কার।  বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় বিজেপি সবচেয়ে বেশি অনুদানের অর্থ সংগ্রহ করতে পেরেছে।

এছাড়া নির্বাচনের আগে বিরোধী নেতাদের বাড়িতে কর কর্মকর্তারা হানা দিয়েছেন। ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বিরোধীদলগুলো যে কোনো আসনে জয়লাভ করতে পারবে এটা ভাবতেও অদ্ভুতই লাগে।

এদিকে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনও নরেন্দ্র মোদির দলের প্রতি খোলাখুলিই পক্ষপাতিত্ব করেছে। মোদির নির্বাচনী নিয়মের লংঘনকে তারা তিরস্কার করতে ভয় পেয়েছে। ফলে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দুই ধরণের নিয়ম দেখতে পাওয়া গেছে। একটি বিজেপির শীর্ষ নেতাদের জন্য অপরটি অবশিষ্ট রাজনীতিকদের জন্য।

ভারতীয় নির্বাচন কমিশনার মোদির ব্যাপারে অনেক উদার ছিলেন। তিনি জানতেন এতোসব পক্ষপাতিত্ব সত্ত্বেও তিনি নিস্তার পেয়ে যাবেন। এবং তিনি তা পাচ্ছেনও। ফলে যে কেউ আশ্চর্য হয়ে ভাবতে পারেন, মোদি কেন ৫৪২টি আসনের সবকটিতেই জয়ী হবেন না? আপনি যখন প্রতারণা করেন, তখন আম্পায়ার যদি দেখেও না দেখার ভান করে তাহলে আপনার কোনো উইকেটই হারানো উচিত হবে না।

এছাড়া মানবপ্রকৃতিও এক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। অনেক সময় মানুষ ভাবতেই পারে যদি নরেন্দ্র মোদি তাদের জন্য এতোটাই সেরা নেতা হয়ে থাকেন, তাহলে অন্য কোন নেতাকে কেন পরখ করে দেখতে হবে? কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী হয়তো নেতা হিসেবে ততোটা খারাপ নাও হতে পারেন। তারপরেও জনগণ পরীক্ষিত নেতার পক্ষেই থকতে চান। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে বিজেপি কেন একটি আসনও হারবে?

মানুষ কাউকে শত্রু ভাববে কাউকে তার মিত্র। এটাই মানুষের স্বভাব। বিজেপি মানুষের স্বভাবের এই দিকটি নিয়ে সবসময়ই খেলে এসেছে। বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ আসামের মত সমগ্র ভারতজুড়ে জাতীয় নিবন্ধন কর্মসূচির হুমকি দিয়েছিলেন।  এর মাধ্যমে মূলত তিনি লাখ লাখ ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছেন। সংখ্যালঘু মুসলমানকে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের শত্রু বানিয়ে তিনি মূলত দেশের অর্থনৈতিক দূরবস্থার চিত্র ঢাকতে চেয়েছেন।

মানুষজন আশ্চর্য হয়ে ভাবতেই পারেন, যে দেশে শতকরা ৭৯ শতাংশ হিন্দু সে দেশে বিজেপির মত হিন্দুত্ববাদী একটি দল কি করে একটি আসনেও পরাজিত হতে পারে। ফলে মনে হতেই পারে, কোন কোন বুথফেরত জরিপ হয়তো বিজেপিকে একটু কম আসনই দিয়েছে। তাদেরতো সবগুলো আসনেই জয়লাভ করা উচিত।

ফলে বুথফেরত জরিপগুলোকে বিশ্বাস করা যায় না। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন জোটের অবশ্যই ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৫৪২টিতেই জয়লাভ করতে হবে, যা ভারতে ইতিহাস সৃষ্টি করবে। ৫৪২ টি আসনের মধ্যে যেকোনো একটি আসন কম পাওয়া মোদির পরাজয়েরই নামান্তর।

উল্লেখ্য, তামিলনাড়ু রাজ্যের ভেলোরের নির্বাচন বাতিল করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এই আসনে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ব্যাপক অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে এটির নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে। তবে যখন এই আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তখন এটিও এনডিএ জোটের দখলেই যাবে বলে আশা করা যেতেই পারে। ফলে ৫৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি ৫৪৩টি আসনই পেতে পারে।

লেখক : ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

 

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0222 seconds.