• ১৯ এপ্রিল ২০১৯ ২১:৪৮:৪০
  • ১৯ এপ্রিল ২০১৯ ২১:৪৮:৪০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

গণধর্ষণ-ধর্ষণ কী মহাগণতন্ত্রের মহা-আলামত?

প্রতীকী ছবি

মাথাপিছু আয়, প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ। নানা রকম মানুষ, হরেক রকম চিন্তা, ধর্ষণেও তাই আছে বৈচিত্র্য। দশ মিনিট আগে কুমিল্লায় ধর্ষণ হলে, বিশ মিনিট পর চট্টগ্রামে। তার কুড়ি মিনিটের মাথায় দিনাজপুর চুয়াডাঙ্গা কিংবা মাদারীপুর কোথাও না কোথাও ধর্ষণ হবেই। অমুক জেলা এগিয়ে যাবে, অমুক পিছিয়ে পড়বে তাতো হবার নয়! সাম্যবাদ।

দেশের অনান্য ক্ষেত্রে নানা রকম বৈষম্য থাকলেও ধর্ষণের ক্ষেত্রে চলছে অবাধ সাম্যবাদ। আর ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। মোল্লা পুরুত, শ্রমিক কৃষক, শিক্ষক সুশীল ডান ও বাম, সবার অংশগ্রহণে ধর্ষণ এক জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে যেমন এখানে ভোট হয়, ধর্ষণও অনেকটা সে রকম।

অমুক মার্কায় অমুক ভাইকে ভোট দেননি তো ধর্ষণ। ধর্ষণের পর মামলা করতে যাবেন সেখানেও হবে নানা গণতান্ত্রিক উৎসব। গণতন্ত্রে যেমন বিরোধীরা সরকার পক্ষকে নানা কাজে বাধা দেয়। এখানেও তেমন। নানা গণপক্ষ এক হয়ে আপনাকে বাধা দেবে। আসবে হুমকি ধামকিও। এখানেই শেষ নয়, এদেশে ভোটে যেমন কারচুপির কোনো আলামত খুঁজে পায় না নির্বাচন কমিশন, তেমন ডাক্তারও খুঁজে পাবে না ধর্ষণের কোনো আলামত। হরেক টালবাহানা আর হরতালের পর আন্দোলনের চাপে পুলিশ মামলা নেবে, গ্রেপ্তার হবে ধর্ষক। তার কয়েকদিন পর শোনা যাবে জামিন পেয়ে যাচ্ছেন গণধর্ষকদের মধ্যমনি মদন ভাই। যেমনটা এদেশের নেতাদের বেলায় সচারচর হয়ে থাকে। আবার আসবে চাপ। এবার পদক্ষেপ নেবে স্বয়ং আদালত। গণতান্ত্রিক উপায়ে এক সুবিচারকের আদেশ খারিজ করে দেবেন কয়েকজন মিলে।

গণধর্ষণ পেরিয়ে যদি একক ধর্ষণে চোখ রাখা যায়, সেখানেও মিলবে গণতন্ত্রের নিদর্শন। গণতন্ত্র যেমন গণ-অধিকারের বুলি আওড়ায়, ঠিক এই একক ধর্ষণেও আছে একটা গণ'র ছাপ। যেমন দুই বছরের কন্যাশিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ, হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান, সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যাগুরু; কারো নিস্তার নেই ধর্ষকের হাত থেকে। আবার ধর্ষকে ক্ষেত্রেও আছে গণতান্ত্রিক অবস্থান। ১২ থেকে ৯২, সব বয়সী পুরুষেরই অংশ গ্রহণ আছে ধর্ষণে। শহরতলী থেকে গ্রাম, গার্মেন্ট কর্মী থেকে গৃহবধূ কারো রক্ষা নেই। নিস্তার নেই উপাসনালয় সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ কর সন্যাসীনিরও। নারী নয় ধর্ষণের শিকার হন ছোটো ছোটো বালকরাও। একে অবশ্য ভদ্র সমাজ লিঙ্গ ভেদের দেয়াল টেনে ডাকেন বলাৎকার নামে। এই বলাৎকারের ঘটনা আবার সবচেয়ে বেশি ঘটে ধর্মীয় শিক্ষালয়ে। যেখানে মানুষ শুদ্ধ জ্ঞানে নিজেদের সন্তানকে পাঠান পরকালের সুন্দর জীবনের আশায়।

ধর্ষণের স্থানেও গণতান্ত্রিক বৈচিত্র্য স্পষ্ট বিদ্যমান। ঘরের কপাট দিয়ে থাকা নারীরাও রেহাই পান না ধর্ষণের হাত থেকে। চাক বা না চাক গণতন্ত্র-উন্নয়ন যেমন সবার দোড়গড়ায় পৌঁছে যায়, ধর্ষণও তেমন। দরজা ভেঙে হলেও ঘরে ঢুকবেই। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেমন নানা গণতান্ত্রিক দলের ডালপালা মেলা সংগঠন আছে, তেমন আছে ধর্ষক-নিপীড়ক সংঘও। গণতন্ত্রের পাশাপাশি চলে হয়রানির চর্চাও। রক্ষকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকও কখনো-সখনো হয়ে ওঠেন ভক্ষক। পছন্দ মতো শিক্ষার্থীকে নানা প্রলোভনে ছিড়েকুড়ে খান। প্রস্তাবে রাজি না হলে চলে নানা ধরনের শারীরিক-মানসিক নির্যাতন। রাস্তাঘাট, কর্মস্থল সব জায়গায় লুকিয়ে আছে ধর্ষক দল। সময়-সুযোগ বুঝে তারা হামলে পড়েন শিকারের ওপর। এমনকি উপাসানালয়েও নিরাপদ নয় নারীরা। উপাসানালয়ের দরজা আটকে নারী শরীরে হামলে পড়ার ঘটনাও এখানে বিরল নয়।

এমনকি নিকটাত্মীয়দের কাছেও নিরাপদ নয় নারীরা। গণতন্ত্রে যেমন এক ভাই আরেক ভাইয়ের গলায় ছুরি ধরতে দ্বিধা করে না, চাচায় সুযোগ বুঝে ভাতিজার গলা কেটে দেয়, ভাগ্নে লোটে মামার সম্পদ। ধর্ষণের বেলায়ও তেমন শরীরটাই মুখ্য হয়ে ওঠে ধর্ষকের কাছে, সম্পর্কটা বড়ো কথা নয়। খালাতো, মামাতো-চাচাতো ভাই তো দূরের কথা, অনেক সময় আপন চাচা-মামার হাত থেকেও রেহাই পান না নারীরা। ঘটনা ঘটানোর পর, অনেক ক্ষেত্রে স্বজন-ধর্ষক রাজনৈতিক নেতাদের মতো গণতান্ত্রিক সুরে বলে ফেলেন, ‘সরি’। ‘আমি আসলে এমনটা করতে চাইনি। আসলে এই পরিস্থিতিটে মাথাটা ঠিক রাখতে পারিনি আরকি।’ কিন্তু ব্যাপারটা ভিন্ন অধিকাংশ সময়ই স্বজনদের এই কাণ্ড থাকে পূর্বপরিকল্পিত। স্বজন পেরিয়ে পুরুষ-বাবার কাছেও নিরাপদ নয় নারীরা। পত্রিকার পাতা খুললে ‘বাবার লালসার শিকার এতো বছরের তরুণী-কিশোরী’ এমন খবর আজকাল খুব একটা বিরল নয় বরং অনেকটাই স্বাভাবিক ঘটনা!

আরেকটা গণতান্ত্রিক আলামত আছে ধর্ষণ-নিপীড়ন-হয়রানি কাণ্ডে। তা হলো স্বেচ্ছায় দাবি না মানলে আন্দোলন করে নেয়া। তাতেও কাজ না হলে অগ্নি নিক্ষেপেও দ্বিধা করে না ধর্ষককূল। ফেনীর সোনাগাজীতে নুসরাতের বেলায় এমন গণতান্ত্রিক ধর্ষণ-নজির দেখেছে বাংলাদেশ। প্রথমে নবাব সিরাজ প্রশ্নের টোপ দিয়ে নুসরাতকে চেয়েছিলেন। যেমন টোপ আমাদের দেশের নেতারা ভোটের আগে জনগণের সামনে ঝুলান। নুসরাত রাজি না হওয়ায়, জোর করে শরীর ছুঁয়েছেন সিরাজ। যেমন করে স্বেচ্ছায় ভোট না দিলে কেন্দ্রের দখল নিতে মরিয়া হয় ক্ষমতাসীনরা। তারপর নুসরাত মামলা ঠুকেছেন থানায়। সেখানেও ঘটেছে নানা ঘটনা। গণতন্ত্রে যেমনটা ঘটে আরকি। সহজে সরকারি দলের বিপরীতে মামলা নিতে চায় না পুলিশ, উল্টো অভিযোগকারীকেই ফাঁসানোর চেষ্টা চলে। নুসরাতের বেলায় তাই ঘটেছে। এরপর নানা চাপে সিরাজ আটক হলেও রেহাই পাননি নুসরাত। গণতন্ত্রের ক্ষমতাসীন সিরাজ, আগুন ঢেলে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছেন নুসরাতকে। কারাবন্দি হাতেই কৌশলে তিনি করেছেন খুন। রাস্তায় যেমন তেল ঢেলে আগুন জ্বালে আমাদের গণতন্ত্র।

মজার বিষয় ধর্ষকের শাস্তির ব্যাপারে এই গণতন্ত্র উদাসীন। ভাবটা এমন দোষ সব ধর্ষিত নারীর। যেমন ঘটে বিরোধী পক্ষকে শাসিয়ে আসার পর আমাদের নেতারা গণতান্ত্রিক বাক্যে বলেন, ‘ঠিক আছে ব্যাপারটা দেখছি।’ এখানেই শেষ। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান বলছে ২ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল, ১৫ দিনে বাংলাদেশে হয়রানি- ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৭ শিশু। এটা শুধু শিশুর হিসেব ও নিবন্ধিত ঘটনার বিবরণ। প্রাপ্তবয়স্ক নারী আর অনিবন্ধিত ঘটনা হিসেবে টানলে এ সংখ্যা তিনগুণ হবে নির্ঘাত। এভাবেই গণতান্ত্রিক উন্নয়নমুখী দেশে মানুষগুলো দিনকে দিন সংখ্যা হয়ে যায়। প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ে ধর্ষণের সংখ্যা। অসংখ্য এমন ঘটনার মধ্য থেকে কোনো ঘটনা যদি বড়ো হয়ে ওঠে, আর চাপা দেয়া না যায়। তখন নানা মহল থেকে আসে হরেক বিবৃতি। আর বিবৃতির আড়ালে তিন দিনেই চাপা পড়ে ঘটনাগুলো। ফলে ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে।

এবার আরেক নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। গণতন্ত্রে যেমন বিশ্বে রোল মডেলের দাবিদার দেশটি। তেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও রেখেছে ধর্ষণ কৃতিত্বের ছাপ। পাকিস্তান থেকে এ দেশে বেড়াতে আসা শিশুটিও রেহাই পায়নি ধর্ষকের হাত থেকে। অবাক করা বিষয়, এ নিয়ে আমাদের কোনো বিকার নেই। উল্টো মেয়েটার নামের আগে পাকিস্তানী জুড়ে দিয়ে অনেকে মেতেছে নগ্ন উল্লাসে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে এ যেনো বিশ্ব জয়। কোনটা বিজয় আর কোনটা লজ্জার এটাই বোঝে না এই অন্ধ চেতনায় মগ্ন ধ্যানী জাতি। এরা বুঝতে অক্ষম গণ দিয়ে শুরু হওয়া সব গণই সুখকর নয়। যেমন সুখকর নয় গণরিয়া।

গণধর্ষণে গণ-অংশগ্রহণ থাকলেও এটা বুক ফুলিয়ে বলার মতো কোনো বিষয় নয়। এটা নিখাদ-নিপাট লজ্জার। তাই গণতন্ত্র নিয়া গর্ব করার করুন, গণধর্ষণ-ধর্ষণ-নিপীড়নকে জাতীয় গৌরবে পরিণত করবেন না দয়া করে। সব নিপীড়নের বিরুদ্ধেই আমাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থান হোক জাস্ট জিরো টলারেন্স। তবে সেই নীতি যেনো খুনের বদলা খুন, ক্রুশের বদলে ক্রসফায়ার, চোখের বদলে চোখ জাতীয় প্রতিহিংসায় গিয়ে না ঠেকে। সেদিকেও লক্ষ্য রাখা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0201 seconds.