• ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ১৪:০৫:৪৩
  • ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ১৪:২২:৫০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ফেরদৌসরা কি সত্যিই আমাদের বোকা ভাবেন?

রবিবার কলকাতার উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী কানহাইয়ালাল আগরওয়ালের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন ফেরদৌস। ছবি : সংগৃহীত

গণিকারা টাকার তরে দেহ বেচেন। আমরাও বেচি। তারকারাও বেচেন। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়, যাদেরকে আমরা গণিকা বলে গালি দেই, নাম শুনলেও থুথু ফেলি; তাদের অধিকাংশই শরীরটা বেচেন বাঁচার তাগিদে, স্রেফ পেটের দায়ে। রোজ দেহ বিকোবার পরও তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন মনটাকে বাঁচিয়ে রাখার।

আর আমরা? অধিকাংশ সময়ই দেহ, মাথা ও মেধার সাথে মনটাকেও বেচে দেই। তারকা নামের প্রাণীদের অবস্থা আরো ভয়াবহ, এরা রূপ বেচে, হুপ বেচে; যখন তখন যেখানে সেখানে দেহ এলিয়ে দেয়। মন বলে আদৌ এদের কিছু থাকে কিনা সেটা গবেষণা সাপেক্ষ। থাকলেও তা সাধারণের গোচরে নয়।

গণিকা আর কথিত আম পাবলিক বেচা বিক্রির বেলায় একটু এদিক ওদিক তাকায় অন্তত, দেখে নেয় পরিচিত কেউ আছে কিনা। আবার নিজের আত্মসম্মান রক্ষার সাথে সাথে অন্যের মর্যাদা যাতে খোয়া না যায় সেদিকটায়ও খেয়াল রাখে। কিন্তু তারকাদের ওসবের বালাই নেই, টাকা দিলে চোর-বাটপার-বেহায়া সবার সাথে এরা মঞ্চ ভাগাভাগি করতে পারে, তাদের পক্ষ নিয়ে ভোট চাইতে পারে। ভেজাল সরষে তেলকে যেমন টাকার লোভে বলতে পারে, ‘নিন খেয়ে দেখুন, মেখে দেখুন, এক্কেবারে খাঁটি! আমিও রোজ দু-চামচ করে খাই, গায়ে-পিঠে-ঠোঁটে ও পাছায় মাখি।’ ঠিক তেমন করেই মহা চোরের সাথে মঞ্চে উঠে এরা অবলীলায় বলে যায়, ‘মদন ভাইকে ভোট দিন, মদন ভাই ভালো লোক, জয়ের মালা তারই হোক।’ সঙ্গে থাকে ষোলো পাটি দাঁত কেলিয়ে দেয়া ট্রেড মার্ক মেকি হাসি।

অনেক তারকা তো আবার খ্যাতির জোরে রীতি মতো রাজনীতিবিদ বনে যান। রাতারাতি ভিড়ে যান মলম পার্টি, কলম পার্টির মতো হরেক নামের দলে। এই দলে ভেড়া তারকাদের কাণ্ড আবার আরো ভয়াবহ। যিনি সিনেমা থেকে রাজনীতিতে আসেন, তিনি সভা মঞ্চকে রীতি মতো শ্যুটিং সেট বানিয়ে ফেলেন, নানা রঙে ঢঙে হাসেন কাঁদেন গান। অনেকে তো আবার ওপার বাংলার মিমি চক্রবর্তীর মতো হেড়ে গলায় চেঁচিয়ে বলেই ফেলেন, ‘আমি এখানে শ্যুটিং ফেলে আসছি কেনো? আমার তো এখানে আসার দরকারই নেই, এসেছি আপনাদের সেবা করতে। বিষয়টা আপনাদের বুঝতে হবে। আমার নয়, আপনাদের স্বার্থেই আমাকে ভোট দেবেন।’

বলার ধরনটা এমন যে, তার সামনে একদল বখাটে ভিলেন দাঁড়িয়ে আছে শ্যুটিং সেটে; চেঁচিয়ে তিনি তাদের শায়েস্তা করে চলেছেন। জনগণ আর সিনেমার ভিলেনের পার্থক্য বোঝেন না অথচ তিনি রীতি মতো নেতা বনে গেছেন তারকা খ্যাতির জোরে। আবার আরেকটা ঘটনা ঘটিয়েছেন যেচে জনসেবা করতে যাওয়া মিমি, মানুষের সাথে হাত মিলিয়েছেন গ্লোবস পরে। মিমি নয় এরকম আরো অনেক তারকাকাণ্ডে সরগরম ভারতের রাজনীতির মাঠ। এদেশেও এমন উদাহরণ অসংখ্য। কেউ ক্রিড়া দেবতা, এমপি হওয়ার ডাক পেয়ে ছুকছুক করে বাছ-বিচারহীনভাবে ভিড়ে গেছেন দলে। কেউ গলা বাজাতে পারদর্শী মানে গায়ক দলে ডাক পেয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন। জনগণকেও রেখেছেন দাঁড় করে। এরকমভাবে খেলার মাঠ থেকে গড়ের মাঠ সব তারকারাই পলিটিক্যাল মঞ্চে। কেউ করছেন প্রচার কেউ সোকল্ড জনসেবা। কে নেতা আর কে অভিনেতা বোঝাই মুশকিল।

সম্প্রতি এপার বাংলার প্রচার মাঠ কাঁপিয়ে ওপার বাংলায় প্রচারণায় গিয়ে রীতিমতো বাঁশ খেয়েছেন অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ। এ বাঁশ আবার যেই সেই বাঁশ নয়, কঞ্চিসহ আঁচাছা বাঁশ। পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর দায়ে তার ভিসা বাতিল করেছে ভারত সরকার। তড়িৎ গতিতে ফেরত পাঠানো হয়েছে দেশে। এখানেই শেষ নয় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ভিসার শর্ত ভঙ্গের দায়ে কালো তালিকায় ঠুকে দিয়েছে ফেরদৌসের নাম। সবমিলিয়ে যেটা হলো আপাতত কয়েক মাস আর ওপার বাংলায় পা রাখতে পারছেন না প্রচার উন্মাদনায় মত্ত ফেরদৌস।

তিনি এতটাই প্রচার পাগল মানুষ যে প্রচারের নেশায় ভুলে গিয়েছিলেন যে তিনি ও দেশের নাগরিক নন। অবচেতনেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন দিদির (মমতা) প্রচার সারিতে। আমি নয় ফেরদৌস নিজেই নাকি এটাকে অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে আখ্যা দিয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, গণমাধ্যমের খবর অন্তত তেমনটাই বলে। ভুল মানেই তো অনিচ্ছাকৃত, সেখানে কেনো ফেরদৌসকে জোর গলায় বলতে হচ্ছে ‘ভুলটা অনিচ্ছাকৃত।’ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন কাজ করলে সেটাকে কী আর ভুল হিসেবে চালিয়ে দেয়ার উপায় থাকে?

এই যে অনিচ্ছাকৃত ভুলের একটা অন্য মানে আছে, সেটা টাকা। এপার বাংলায় যেমন অর্থের জন্য প্রচার চালিয়েছেন(নগদ না নিলেও অন্য সুযোগ সুবিধায় পুষিয়ে যাবে নির্ঘাত, যেমনটা এদেশে অহরহ ঘটে। রাজনীতির মাঠে স্বার্থ ছাড়া কেউ নামে কী?)। ওপার বাংলায়ও তেমনটা করেছেন ফেরদৌস। অবচেতনে তিনি কলকাতার কোনো সিনেমা হলে যেতে পারতেন, শপিং মলে গেলেও কেউ তাকে আটকাতো না। যেতে পারতেন শিলিগুড়ি, দার্জিলিংয়ে। খাঁটি চায়ে চুমুক দিয়ে দেখতে পারতেন কাঞ্চনজঙ্ঘা। তিনি সেসব কিছুই করলেন না, গেলেন নির্বাচনী মাঠে! আগে জানতাম ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে৷ এখন দেখছি না স্বর্গে যাওয়া ঢেকির ধান ভাঙার চেয়ে গম পেষাতেই বেশি আগ্রহ। কোথায় ফেরদৌস অনিচ্ছাকৃত ভুলে যাবেন সিনেমা পাড়ায়, পুরনো বন্ধু ঋতুপর্ণার বাসায় চা পানে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিলো না। কিন্তু তিনি গেলেন রায়গঞ্জ, কানাইয়ালাল দাদার দরবারে। সব নগদ নারায়ণ আর উপরি পাওনার লোভ। দিদি খুশি থাকলে সব খুশ। সাথে পাঁচ বছর যাতায়াত থেকে গতায়াতের অবারিত সুযোগ। দিদির বাসায় অর্ধেক চায়ের পুরোটা খাওয়ার নেমন্তন্ন, আরো কতো কী।

ফেরদৌস এসব করতেই পারেন। তিনি অভিনেতা মানুষ। তার ফেস ভ্যালু আছে। ওপার বাংলা এপার বাংলায় তিনি সমান জনপ্রিয়। আমি ঠিক জানি না, পত্রিকা-টিভিওয়ালারা বরাবরই এই কথা লেখে/বলে আরকি। যাকগে, বিজ্ঞাপণের মতো টাকার বিনিময়ে তিনি নির্বাচনী প্রচারণা চালাতেই পারেন। অথবা যাচ্ছেতাই করতে পারেন। এপারে পারলে তিনি ওপারে পারবেন না কেনো? সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন! নির্চানী প্রচার আর অর্থের তো কোনো সীমানা দেয়াল নেই। কেবল নামের বদল, ওপারে যা রুপি এপারে তা টাকা। এপারের আপা ওপারে দিদি, এপারে ভাই ওপারে দাদা। একই কাজে এপারে উৎকোচ মেলে, ওপারেও মেলে৷ তো করতে বাধা কই? দুই বাংলায় জনপ্রিয় ফেরদৌসের তো সমহারে দুইপাড়েই প্রচারণা চালানোর অধিকার আছেই। এটা পপুলারিটির লিগ্যাসি। বেরসিক ভারতীয় আইন সেটা বুঝতে অক্ষম, বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো গণতান্ত্রিক দেশটা আবারো প্রমাণ করলো সত্যিই আইন একচোখা, অমানবিক, অন্ধ! 

এ পর্যন্ত আমার আপত্তি না থাকলেও আপত্তিটা অন্য জায়গায়। কেবল তলে তলে না প্রকাশ্যে জল খাওয়া ফেরদৌস যখন আমাদের মতো আম জনতার কাছে, অনিচ্ছাকৃত ভুলের ধোঁয়া তুলে ক্ষমা চান। ক্ষমা চাওয়ার কী আছে। বাণিজ্য ভিসায় ভারতে যাওয়া আসা করা ফেরদৌস অবশ্যই জানেন ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি দুটোই আছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে উনি এবার লসে পড়েছেন, বেশ। ব্যাপারটা ওনার ব্যক্তিগত। যাওয়ার সময় যেহেতু আমাদের বলে যাননি, যাওয়ার অনুমতি-আশীর্বাদ কোনোটাই চাননি। ধরা খেয়ে এসে কেলিয়ে  ক্ষমা চাওয়ার মানেটা কী? খুব স্বচ্ছ-জবাবদিহিপূর্ণ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ? বোঝাতে চান ভক্ত-অনুরাগীদের প্রতি তার দায়বদ্ধতা অপরিসীম? নাকি অর্থলোভী ইমেজ লুকাতে চাইছেন দেশপ্রেমের ভান করে? উনিও কী রাজনৈতিক নেতাদের মতো আম জনতাকে বোকা ভাবেন? মনে করেন উনি যা বলবেন জনগণ টপাক করে তাই খেয়ে নেবে? যেমন ভাবেন আমাদের খেলুড়ে দেবতা হনু প্রসাদ। সাক্ষাৎ পক্ষ নিয়ে বলেন, ‘আমি সবার। কোনো দলের নই। খেলা আর রাজনীতিকে এক করে দেখবেন না প্লিজ!‘ অথচ খেলুড়ে ইমেজই তাকে দিয়েছে দলীয় টিকিট, অবাধ ভোট কাটার অধিকার। তিনিও হয়তো আম জনতকে ফেরদৌসের মতোই বোকা ভাবেন। নেতা থেকে অভিনেতা আম জনতা নিয়ে সবার ধারণাই হয়তো এক।

লেখক : সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0186 seconds.