• ১৩ এপ্রিল ২০১৯ ১৫:২৪:৪৬
  • ১৩ এপ্রিল ২০১৯ ১৫:২৪:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

অ্যাসাঞ্জের হাতকড়া আমাদের কী বলে?

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ছবি : সংগৃহীত


নাজমুল রানা :


কয়েকজন কালো পোশাকের পুলিশ একটা ভবনের ভেতর থেকে পশুর মতো টেনে হিঁচড়ে বের করে আনছে এক মানব অবয়বকে। সবগুলো ক্যামেরার লেন্স তাক করা সেই মানব অবয়বের দিকে। হাতকড়ায় আবদ্ধ দুহাতের এক হাতে একটা বই। আরেক হাত নড়ছে না-সূচক ভঙ্গিতে। মুখ ঘাড় মাথা একসাথে ঝুঁকিয়ে শুভ্র কেশ-দাড়ির লোকটা বলে চলেছে, এট ঠিক হচ্ছে না। এটা বেআইনি। কিন্তু কৃষ্ণ পোশাকের আইনি লোকগুলোর সেদিকে কান দেয়ার সময় নেই। তারা ব্যস্ত ৪৭ বছর বয়সী মানব অবয়বটাকে খাঁচায় পুরতে।

চেহারায় আশি বছর বয়সী বৃদ্ধের বার্ধক্যের ছাপ নিয়ে কাচঘেরা গাড়ির মধ্যে মিলিয়ে গেলেন অ্যাসাঞ্জ। মানে সেই ২০১০-এর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ইরাক-আফগান যুদ্ধের গোপন নথি ফাঁস করে যিনি গোটা বিশ্বের গোপনীয়তার রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিকে একটা বড়ো ধাক্কা দিয়েছিলেন। উইকিলিকস নামটা শুনলে তাই এখনো সবার বুকের ভেতর একটা ধাক্কা লাগে। নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হন গোপন সংস্কৃতির ধারক বাহকেরা। অ্যাসাঞ্জ রাষ্ট্রের নগ্ন চরিত্র সবার সামনে উলঙ্গ করে দেয়ায় আমজনতার হাততালি পান, জায়গা করে নেন বুকের ভেতর। মানুষ দেখলো কেমন করে জনকল্যাণের নাম করে বিশ্ব নেতারা তাদের টাকায় কেনা অস্ত্রে মানুষ মেরে চলেছেন।

আম জনতার হাততালি পাওয়া হিরো অ্যাসাঞ্জ হয়ে গেলেন বিশ্ব মোড়ল আমেরিকার চোখের বালি। তাকে ধরতে মরিয়া হয়ে গেলো আমেরিকা। আর আমেরিকার বিপরীতে গিয়ে অ্যাসাঞ্জকে আশ্রয় দেয়ার সাহস হলো না সুইডেনের। অস্ট্রেলিয় বংশোদ্ভূত এই সুইডিশ নাগরিকের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেলো খোদ সুইডেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে আনা হলো যৌন হয়রানির অভিযোগ। দিশেহারা অ্যাসাঞ্জ গেলেন মহাগণতান্ত্রিক বুলি আওড়ানো যুক্তরাজ্যে। কিন্তু উল্টো খড়গ। ২০১২ সালে আশ্রয় নিলেন ইকুয়েডর দূতাবাসে। আপাতত গ্রেপ্তার এড়ালেও ঢুকলেন বন্দি জীবনে। পর্যায়ক্রমে নামলো নানা ধরনের মানসিক অত্যাচারের তরবারি। নথি ফাঁস করে যে অনলাইন দুনিয়া কাঁপালেন তিনি, সেখানেই প্রবেশাধিকার হারালেন। বদ্বীপ থেকে হয়ে পড়লেন জন বিচ্ছিন্ন নির্জন দ্বীপ। স্রেফ শরীরে বেঁচে থাকা জীবনে পা রাখলেন দুনিয়ার গোপনীয়তায় আঘাত হানা অ্যাসাঞ্জ। তাকেই রাখা হলো গোপন করে।

ইকুয়েডরের ক্ষমতায় পালা বদল শেষ পর্যন্ত বদল আনলো অ্যাসাঞ্জের ভাগ্যে। আশ্রয়ের আঁতুর ঘরের ত্রাতারাই তাকে তুলে দিলো যমের হাতে। ইকুয়েডরের সাবেক প্রেসিডেন্ট রাফায়ের কোরেইয়া ছিলেন অ্যাসাঞ্জের প্রেমের আশ্রয়, আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট লেনিন মোনেরোর চক্ষুশূল। কারণ তার দুর্নীতির নথিও ফাঁস করে দিয়েছিলেন অ্যাসাঞ্জ গং ওরফে উইকিলিকস। মোনেরোর আবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খুব সুরিত-পিরিত। প্রেম আর প্রেমহীনতার বলি এই ৪৭ বছরের ক্লান্ত তরুণ। কাঁটা দিয়ে চলছে কাঁটা তোলার খেলা।

অবশ্য ২০১৬ সালে হিলারির গোপন ইমেইল ফাঁস করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুনজর পেয়েছিলেন অ্যাসাঞ্জ। দু-একটা জনসভায় তাকে ভালোবাসেন কিংবা তিনি ঠিক কাজই করেছেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ট্রাম্প। মানে শত্রুর শত্রু নির্ঘাত আমার মিত্রই বটে। নির্বাচনী ধাক্কা সামলে হিলারি বধ করে প্রেসিডেন্টের চার বছর সময় সীমার দ্বারপ্রান্তে এসে অ্যাসাঞ্জের ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের তাৎক্ষণিক তৎপরতা ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে বৈ কি! হতে পারে নানা ঘটনায় বিতর্কিত ট্রাম্প ইমেজ ফেরাতে অ্যাসাঞ্জকেই ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করবেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যেটা করেছেন। কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ১৪ ফেব্রুয়ারির সন্ত্রাসী হামলা, তার জেরে পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা। আর সেই হামলার কৃতিত্ব ফলাও করে প্রচার করে হারানো ইমেজ ফিরিয়ে ভোট বাগানোর লড়াই। কৃষক অসন্তোষ, বেকারত্ব, রাফায়েল দুর্নীতি নানা কাণ্ডে নাকাল মোদী জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া আর জাতীয় নিরাপত্তার ধোঁয়া তোলার চেষ্টা করছেন পাক-ভারত উত্তেজনাকে তুরুপের তাস হিসেবে কাজে লাগিয়ে।

ট্রাম্পও সেভাবে কাজে লাগাতে পারেন অ্যাসাঞ্জকে। চার বছরে অভিবাসন নীতি, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ, রাশিয়ার সাথে আঁতাত, বন্দুক আইন নিয়ে নমনীয় ভাবসহ নানা কারণে সমালোচিত ট্রাম্পও ইমেজহীন। অর্থনৈতিক সংস্কার কিংবা নির্বাচনী স্লোগান আমেরিকা ফার্স্ট কোনো কিছুতেই চমক দেখাতে পারেননি তিনি। উল্টো একঘেঁয়ে আচরণে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। তাই শেষ সময়ে আরেক চমক লাগাতে দেশপ্রেম-জাতীয়তাবাদই ট্রাম্পের একমাত্র তুরুপের তাস। ডেমোক্রেটদের বধ করে ক্ষমতার পথ পাকাপোক্ত করতে মিত্র অ্যাসাঞ্জকে শত্রু প্রমাণ করে শূলে চড়ানোই তার জন্য কল্যাণকর। কারণ এই অ্যাসাঞ্জই হাজারো গোপন নথি ফাঁস করে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের হুমকি তৈরি করেছে। তার নথির রেফারেন্সের জেরেই বহু জায়গায় নাকানি-চুবানি খেয়েছে আমেরিকা।

অন্যদিকে নির্বাচন সামনে রেখে যদি অ্যাসাঞ্জ গং আর কোনো গোপন নথি ফাঁস করে দেয়, তবে বিপদ বাড়তে পারে ট্রাম্পের। তাই দেরী না করে হাত কড়াটা পরিয়ে ফেলাটাই ভালো। সেটাই করেছে মার্কিন মিত্ররা। গণতন্ত্র বাক স্বাধীনতা মুক্ত মত ও গণমাধ্যমের ধোঁয়া তোলা ব্রিটিশরাও একদম দেরী করেনি। সব আন্তর্জাতিক আইনকে কাচকলা দেখিয়ে স্টেইলনেস স্টিলের কড়া পরিয়ে দিয়েছে কাশ ফুলের মতো শুভ্র হাতে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতার বাণী কই মুখ লুকালো? কোথায় গণতন্ত্র? কই অ্যাসাঞ্জ তো আত্মপক্ষ সমর্থণের সুযোগও পেলেন না। কেনো পেলেন না? গোপনীয়তায় আঘাত হেনেছেন বলে! এই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো টিকেই থাকে গোপনীয়তার গোপন খামে ভর করে। গোপনীয়তার সংস্কৃতি ভেঙে পড়লে তো রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে হতে হতে ভেঙে পড়বে কোনো একদিন। খুলে যাবে সব গণ-সেবকদের কাছা।

তাই কাছা বাঁচানোর খেলায় উদারতার সব স্লোগানই মুখ থুবড়ে পড়ে, নেতিয়ে যায় মানবতার শিশ্ন। সব নিয়ম-কানুন ভুলে প্রতিবাদীর গলা টিপে ধরে শাষক-শোষক কালো হাত। মজার বিষয় অ্যাসাঞ্জের গ্রেপ্তারে জাতিসংঘ কিছু বলেনি, বাকি বিশ্ব নেতাদেরও মুখে কুলুপ। তিব্বতের দালাইলামা, চীন কিংবা সৌদি আরবের মানবাধিকার কর্মীদের মানবাধিকার নিয়ে যারা কথায় কথায় ঢেকুর তোলার মতো উদ্বিগ্ন হন, সেই মানবতাবাদীরা ঘুমাচ্ছেন নাকে মানবতার ষরষে তেল দিয়ে। কারণ সবারই কাছা খোলার ভয়।

হ্যাঁ এবং অবশ্য অ্যাসাঞ্জের কাজ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকতেই পারে। তাই বলে ধুপধাপ করে হাতকড়া পরানো! প্রশ্নই আসে না। বাহাস-তেবহাস হতে পারে। ফাঁস করা যেতে পারে অ্যাসাঞ্জের গোপন নথিও। কিন্তু বালিশ দিয়ে মুখ চেপে ধরা কেনো? রাষ্ট্র যদি জনগণের হয়, জনকল্যাণেই সব করেন রাষ্ট্রের ত্রাতারা, তবে গোপন-গোপন খেলা কেনো? সব খবর গোপন করার মানেটা কী? কী ক্ষতি এইসব তথ্য জনগণ জানলে? ঘরের খবর তো ঘরের লোকের জানাটা অস্বাভাবিক কিছু নয় বরং খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। অ্যাসাঞ্জ যদি ফাঁসের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলেন বা ঝোলার উপযুক্ত হন। তবে সব রাষ্ট্র ব্যবস্থা আর কর্তা ব্যক্তিদের ফাঁসি হওয়া উচিত। কারণ অ্যাসাঞ্জ কেবল পাপের নথি প্রকাশ করেছেন, পাপ তো করেছেন তারা। খুনের সাক্ষীর ফাঁসি হলে, খুনির বেঁচে থাকার অধিকার বহাল থাকে কী?

লেখক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0204 seconds.