• ১০ এপ্রিল ২০১৯ ২৩:০৬:৪৩
  • ১০ এপ্রিল ২০১৯ ২৩:০৬:৪৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভারতের লোকসভা নির্বাচন ও গণতন্ত্রের শিক্ষা

প্রতীকী ছবি


নাজমুল রানা :


ঢাকঢোল পিটিয়ে চলছে ভারতের ১৭ তম লোকসভা নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। আর চলছে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। যে দল যেভাবে পারছে, যেভাবে পারছে প্রতিশ্রুতি বাক্যে বাগাতে চাইছে ভোট। পাশাপাশি চলছে দোষারোপের খেলা, বিজেপি দুষছে কংগ্রেসকে, আর কংগ্রেস বিজেপিকে।

তবে দোষাদোষী আর বাকবিতণ্ডার মধ্যেও দুই দল এক জায়গায় এক, তা হলো 'কেউ কথা রাখেনি।' নানা ফর্দ তুলে কংগ্রেস বলছে বিজেপি কথা রাখেনি, আর বিজেপি বলছে কংগ্রেস কথা রাখেনি। দুই পক্ষের অভিযোগ এক করে বলা যায়, এর শানে নুযুল হলো আসলে কোনো দলই কথা রাখেনি।

১. কৃষক অসন্তোষ
ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কৃষকের আত্মহত্যা নতুন কিছু নয়। প্রতি বছর হাজারো কৃষক আত্মহত্যা করে ভারতে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কৃষকরাও তাই বারবার রাস্তায় নামেন, বাঁচার দাবি নিয়ে। মোদী আমলেই সবচে বেশি হয়েছে এই কৃষক বিদ্রোহ। কয়েকটি আন্দোলন তো রীতি মতো ধাক্কা দিয়েছে, মোদীর গদিতে। কৃষকদের অভিযোগ, কথা রাখেনি মোদী সরকার। তাদের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও, পাঁচ বছরে কৃষক বান্ধব কোনো পদক্ষেপই নেননি চাওয়ালা থেকে প্রধানমন্ত্রী বনে যাওয়া মোদী।

তাই এ নির্বাচনে গরিবী হঠাও থিওরি নিয়ে হাজির ইন্ধিরা গান্ধীর নাতী রাহুল গান্ধী। বর্তমানে কংগ্রেসের পুরো ভার রাহুলের কাঁধে। তবে রাহুলের এই গরিবী হঠাও নতুন কিছু নয়, ইন্দিরাও বহু বছর আগে একই ধোঁয়া তুলেছিলেন। পাশাপাশি রাহুল বলেছেন, ঋণের দায়ে আর কোনো কৃষকে কারাগারে যেতে হবে না কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে। কিন্তু গরিবী হটেনি। উল্টো বেড়েছে। আম্বানি টাটারা ধনী থেকে মহাধনী হয়েছেন। একশো ৩০ কোটির টাকায় জড়ো হয়েছে তিন চার জনের একাউন্টে। আর এবারের ইশতেহারে মোদীর বিজেপি কৃষক স্বার্থের ব্যাপারটিও উপেক্ষা করেছে কৌশলে।

২. বেকারত্ব
বেকারত্ব ভারতের আরেক বড়ো ব্যাধি। জনসংখ্যা যেমন বড়ো ভারত, তেমন বড়ো বেকার সংখ্যায়ও। ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে বছরে দুই কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা জোর গলায়ই দিয়েছিলেন মোদী। কিন্তু পাঁচ বছরে কাজের কাজ কাচকলা। উল্টো মোদী আমলেই গত ৪৫ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে ভারতের বেকারত্ব। বেকার সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুন। একটি বেসরকারি সংস্থার হিসেব বলছে, শুধু ২০১৮ সালেই চাকরি হারিয়েছে এক কোটি দশ লাখ মানুষ। বর্তমানে ভারতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৪৫ কোটির বেশি। আর প্রতি বছর কাজের বাজারে যোগ দিচ্ছে নতুন এক কোটি মানুষ।

মোদী আমলে ভারতের অর্থনীতি তরতর করে এগোলেও, সে তুলনায় কাজের সুযোগ বাড়েনি মোটেও বলছে কর্ণাটকের আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা। তাই সবমিলিয়ে ভারত ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যকে টপকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতির দেশের তকমা লুফে নিলেও, তেমন কোনো সুফল পাবে না ভারতবাসী। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বিজেপির ইশতেহার এবার এড়িয়ে গেছে বেকারত্বের বিষয়টি। আর কংগ্রেস ইশতেহারে ন্যুনতম আয় প্রকল্প ‘ন্যায়’ নিয়ে মাতামাতি করলেও বেকারত্ব ইস্যু খুব একটা প্রাধান্য পাচ্ছে না। অবশ্য এ নিয়ে মোদীকে নানা প্রচার অনুষ্ঠানে তুলোধুনো করেছেন রাহুল। রাহুলের সাথে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বেকারত্ব আর কৃষক অসন্তোষ ইস্যুতে মোদীকে রীতিমতো ধুয়ে চলেছেন। আর রাহুল এটুকু অবশ্য বলেছেন, ক্ষমতায় এলে ২২ লাখ শূন্যপদে বেকারদের চাকরি দেবেন।

তবে ধোয়াধোয়ির খেলায় বাদ পড়ে যাচ্ছে আসল বিষয়। কেউ আদতে বেকার সংকটের সমাধানের কথা বলছেন না। উল্টো একে অপরকে ঝেরে চলেছেন। মাঝখানে চিড়ে চ্যাপ্টা চাকরির আশায় রোজ পায়ের জুতো ক্ষয় করা বেকারেরা।

৩. দলিত
দলিত মানে ভারতে একেবারেই অচ্ছুৎ। ছোঁয়া তো দূরের কথা কেউ এদের ছায়াও মাড়াবে না। স্বাধীনতার ৭২ বছর কেটে গেলেও এদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং নির্যাতনের পরিমাণ বেড়েছে দিনকে দিন। পান থেকে চুন খসলেই নামে খড়গ। এমন এলাকা আছে যেখানে উচ্চবর্ণের সামনে দিয়ে নিম্ন বর্ণের এসব মানুষেরা একুশ শতকে এসেও জুতা পায়ে হাঁটার অধিকার রাখে না। নিয়মের ব্যত্যয় হলেই চলে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। এদের অনেকে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ ও গুজরাটের দলিতরা ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ২০১৪ সালে মোদীকে ভোট দিয়েছিলো। কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি। বরং মোদী আমলেই আরো বেড়েছে নিপীড়ন। দলিতদের কোটা দেয়ার যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদী, সে বিষয়েও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বিজেপি সরকার। উল্টো উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের জন্য ১০ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা করেছেন মোদী।

এবারের ইশতেহারেও কোনো দল দলিতদের নিয়ে আলাদা করে কিছু বলেনি। নির্বাচনী প্রচারেও কেউ মুখে নেয়নি এদের নাম। তাই কংগ্রেস বিজেপির বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক দলগুলোতেই ভরসা রাখছে দলিত গোষ্ঠীর অনেকে।

৪. মুসলিম
পশ্চিমবঙ্গে মমতার কাছে ভোট ব্যাঙ্ক হিসেবে মুসলিমদের আলাদা কদর থাকলেও, অন্য জায়গায় উপেক্ষিত মুসলিমরা। কোনো বড়ো রাজনৈতিক দলই আলাদা করে ইশতেহারে এদের নিয়ে কিছু বলেনি। মোদী আমলে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে দিন কেটেছে মুসলিমদের। নানা রাজ্যে চলেছে খড়গ। বিশেষ করে গো মাংস খাওয়া, বহন করা, বেচা--এমন নানা অভিযোগে মুসলিমদের গায়ে হাত চড়িয়েছে উগ্রপন্থিরা। অধিকাংশ ঘটনায়ই প্রশাসন থেকেছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়। ভিক্ষা না দিয়ে উল্টো কুকুর লেলিয়ে দেয়ার দশা আরকি।

৫. এনআরসি
মুসলিমদের ওপর মোদী সরকারের আরেক খড়গ। এর যাতাকলে পৃষ্ট আসামের ৪০ লাখ মানুষ। এদের অধিকাংশই মুসলিম। নতুন আইন এনে অন্য ধর্মাবলম্বিদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিলেও মুসলিমদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্সে বিজেপি। যদিও আইনটি লোকসভায় পাস হওয়া আইনটি শেষ অবধি রাজ্যসভায় পাস করাতে পারেনি বিজপি সরকার। বাঙালি-অবৈধ অনুপ্রবেশকারী তকমায় মুসলিম তাড়াতে মরিয়া মোদীর বিজেপি। শুধু আসাম নয়, অনান্য রাজ্যেও এনআরসি বা নাগরিক তালিকা এনে মুসলিম খেদাতে চায় দলটি। আর আসন্ন লোকসভা নির্বাচনেও এটা তাদের অন্যতম তুরুপের তাস।
 
অবশ্য বারবার ভোট ব্যাঙ্ক রক্ষায় এনআরসির বিরোধিতা করে আসছেন মমতা। মায়াবতীও একই কারণে আছেন মুসলিমদের পক্ষে। আর কংগ্রেস অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর এই ফর্মুলা আবিষ্কার করলেও ভোট সামনে রেখে ভোল পাল্টেছে। রাহুল বলেছেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে এনআরসি হবে না। তবে রাহুলের এই কণ্ঠস্বর খুব একটা জোরালো নয়। বলতে হয় তাই বলা ধরনের।

৬. আদিবাসী
আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে প্রাকৃতিক বিশেষ করে খনিজ সম্পদপূর্ণ ভূমি কর্পোরেট সংস্থার কাছে ইজারা দেয়া ভারতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্বেচ্ছায় ভূমি না ছাড়তে চাইলে আদিবাসীদের উৎখাত করা হয় চরমপন্থি-আতঙ্কবাদী-নকশাল-মাওবাদী নানা তকমায়। বারবার আদিবাসীরা এ নিয়ে সোচ্চার হলেও, কোনো সরকারই তাদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এবারের লোকসভা নির্বাচনেও কোনো বড়ো দলের ইশতেহারে গুরুত্ব পায়নি পায়নি আদিবাসী অধিকারের বিষয়টি।

৭. জম্মু-কাশ্মীর
কাশ্মীর হলো লোকসভা নির্বাচনের তুরুপের তাস। উগ্রপন্থিদের পাশে টানতে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নেয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে ইশতেহারে জায়গা দিয়েছে বিজেপি। এমনিতেই পুলওয়ামায় সিআরপিএফ জওয়ানদের গাড়িতে সন্ত্রাসী হামলার পর, কোণঠাসা হয়ে পড়ে কাশ্মীর। ভারত জুড়ে তৈরি হয় এক ধরনের কাশ্মীর বিরোধী মনোভাব। আর সেই পাব্লিক সেন্টিমেন্ট কাজে লাগাতে, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি।

লোকসভা নির্বাচনের ৫৪৩ আসনের মাত্র ছয়টি আসন আছে কাশ্মীরের দখলে। তাই ছয় আসন বলি দিলে বিজেপির তেমন কিছু যায় আসে না।কংগ্রেস অবশ্য ইশতেহারে নির্বাচনী স্বার্থে কাশ্মীর ইস্যুকে খানিকটা জায়গা দিয়েছে। আঞ্চলিক দল হলেও তৃণমূলের ইশতেহারেও জায়গা মিলেছে কাশ্মীরের। আর কাশ্মীরের আঞ্চলিক দলগুলো একাট্টা হয়েছে বিশেষ মর্যাদা রক্ষায়। তাদের নির্বাচনী প্রচারণার মূল এজেন্ডাও আর্টিকেল ৩৭০ রক্ষা।

৮. নারী সুরক্ষা
২০১২ সালে দিল্লিতে গণধর্ষণের শিকার হন মেডিকেল শিক্ষার্থী জ্যোতি সিং পাণ্ডে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা ভারত। বিশ্ব জুড়ে নতুন করে আলোচনায় আসে ভারতের নারী নিরাপত্তার বিষয়টি। এরপর নানা দিকে জল গড়িয়েছে। ঘটেছে আরো অনেক ঘটনা। দফায় দফায় আন্দোলনও কম হয়নি। কিন্তু নারী সুরক্ষার বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি ভারত সরকার। মোদী সরকার নারী সুরক্ষায় অনেক উন্নতির হয়েছে বলে দাবি করলেও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। সরকারি হিসেবে মোদী আমলে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে কয়েক গুন।

তবে অবাক করা বিষয় হলো, ইশতেহারে টেনেটুনে নারীর কর্মসংস্থান উন্নয়ন এসব নিয়ে গাইগুই করে দু চার কথা বললেও, সুরক্ষা নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপের কথা বলেনি কেউ-ই। বড়ো দলগুলোর এমন আচরণে হতাশ হয়ে নিজেরাই নিজেদের ইশতেহার দিয়েছে কয়েক নারী সংগঠন।

এমন আরো অনেক জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দায় সেরে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো গতান্ত্রিক দেশের দাবিদার ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো ব্যস্ত উন্নয়ন, সুরক্ষা, জাতীয়তবাদ, সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ফিরিস্তি নিয়ে। কৃষক-বেকার-নারীকে পাশ কাটিয়ে বিজেপির ইশতেহার তো পুরোদস্তুর মগ্ন দেশ সুরক্ষার স্লোগানে। পুলওয়ামা হামলার প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা চালানোর পর থেকেই, নিজেকে জোর গলায় চৌকিদার বলে দাবি করছেন মোদী। বলছেন, তিনি ভারতের অতন্দ্র প্রহরী। সীমানা পেরিয়ে শত্রু ডেরায় আঘাত হানার সাহস কেবল তারই আছে। বাকিরা কাপুরুষ।

তাই দেশের সুরক্ষার স্বার্থে হলেও তাকে ভোট দেয়া উচিত। পাশাপাশি শিবসেনাকে খুশি রাখতে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরকে জব্দ করার বুলি আওড়ে চলেছেন মোদী। বিপরীতে কংগ্রেস আর বিরোধীরা বলে চলেছেন, চৌকিদার চোর হে। পাশাপাশি কংগ্রেস তুলছে গরিবী হঠানোর স্লোগান। মোদী অবশ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়েছেন কংগ্রেসকে, ‘ইন্দিরা আমল থেকে কংগ্রেস গরিবী হঠানোর ধোঁয়া তুলছে, দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থেকেও কংগ্রেস গরিবী হঠাতে পেরেছে কী?। না, পারেনি। মোদীর আরো বলেছেন, গরিবী হঠাতে হলে এবার কংগ্রেসকেই হঠাতে হবে।

তবে কংগ্রেস অবশ্য মোক্ষম প্রশ্নটা তোলেনি, সেটা হলো এতো দিন কেউ যা পারেনি তাই পাঁচ বছরে করে দেখালেন যিনি, সেই চৌকিদার কেনো গরিবী, বেকারত্ব হঠাতে পারলেন না। পারলেন না নারী সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে।

ব্যাপারটা আসলে ভিন্ন- কে প্রশ্ন করবে কাকে? সবাই তো একই পথের পথিক। মুখে গণতন্ত্রের আর জনকল্যাণের বুলি আওড়ালেও চোখ তো সবার মসনদে। তাই মানুষকে পাশ কাটিয়ে বড়ো হয়ে ওঠে মন্দির, যুদ্ধ, সুরক্ষা ও অস্ত্র ভাণ্ডার সমৃদ্ধির গল্প। তা মানুষ যুদ্ধ-উন্নয়ন চাক বা না চাক। আর গণতন্ত্রে উন্নয়নের খসখসানি নতুন কিছু নয়। মানুষ কতোটা আগালো, জীবন মান কতোটা বাড়লো, সেটা একদমই বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হলো কয়টা সেতু হলো, কয়টা ভবন উঠলো, কে কয়টা রাস্তা বানালো। কার আমলে প্রবৃদ্ধি বাড়লো কতোটা। কে ঢিল ছুড়ে কতোটা স্যাটেলাইট ভূপাতিত করলো, এমন অনেক ফালতু আলাপ। ইট পাথরের উন্নয়নের আলাপে এই রাজনৈতিক দলগুলো যতোটা আগ্রহী ততোটাই এরা অনাগ্রহী মানুষ-মানবিক বিষয় নিয়ে আলোচনায়।

তাই যে দেশ বিশ্ব গণতন্ত্রের আসরে সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে আছে, সে দেশেই মূল্যহীন গণরা। গণদের কথা ভাবতে অক্ষম এই গণতন্ত্র। গণর কদর কেবল ভোট বাক্সে। ভোটের আগে চামার কুমোর সুইপার ডোম সবাই-ই নেতাদের আপন ভাই। ভোট ফুরালেই চুদির ভাই। মসনদে থাকার পাঁচ বছরে তো এই মানুষদের কথা মনে থাকেই না। নির্বাচনী ইশতেহারেও হয় না এদের ঠাই।একই অবস্থা এই দেশেও। ভারতে যেমন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললেই রাষ্ট্রদ্রোহী না হয় আরবান নকশাল। এখানেও তেমন বিপক্ষে গেলেই রাষ্ট্রদ্রোহী। কখনো সখনো রাজাকার। ওখানে তাও মোদীকে বিভিন্ন মাধ্যমে টুকটাক গালাগালি করতে পারে মানুষ। এখানে পাতি নেতাদের নামও মুখে নেয়াও দুষ্কর। ওপারে তাও একটু-আধটু সমালোচনা করা গেলেও এপারের সাংবাদিকতা ঢেকেছে প্রেস রিলিজে। সুশীলরা হয়ে গেছেন ভেড়ুয়া, আর যারা মাথা বেচতে পারেনি তারা আছেন বালুতে মাথা গুঁজে।

তবে মিল হচ্ছে উন্নয়নের ফিরিস্তিতে। দু-দেশেই শুধু উন্নয়ন। মানুষ চাক বা না চাক উন্নয়ন চলছে। আর সেই কেচ্ছা প্রতিদিন আমাদের কানে পৌঁছে দিচ্ছে টিভি রেডিওর মতো নানা মাধ্যম। কান চেপেও রেহাই নেই। কম্বল তুমি ছাড়লেও কম্বল তোমাকে ছাড়বে না। দেশের প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, খাদ্য উৎপাদন সব গণহারে বাড়ছে। সংসদে সে নিয়ে তাল-বেতাল আলাপও হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কয়েক লাখ যুবক চাকরিহীন, নুন আনতে পান্তা ফুরায় কোটি মানুষের। এখনো ধর্ষণের শিকার নারীর গায়ে আগুন জ্বালিয়ে মধ্যযুগীয় তরিকায় মারে ক্ষমতার পাদপ্রান্তে থাকা দাদারা। অর্ধ লাখের বেশি ঋণের বোজা মাথায় চেপে জন্মায় শিশু। কিন্তু রোজ তবু উন্নয়নের গল্প শোনায় মোদীর মতো গণতান্ত্রিক পুঁথি পাঠকরা।

লেখক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ভারত নির্বাচন গণতন্ত্র

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0208 seconds.