• ২০ মার্চ ২০১৯ ১৭:৩৭:৪৮
  • ২০ মার্চ ২০১৯ ১৭:৪৪:৪৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নাগরিক মর্যাদাবোধ ছাড়া ঢাকা নগরী নিরাপদ হবে কি?

ছবি : সংগৃহীত


পারভেজ আলম :


আপনে যখন রিকশায় চড়েন তখন কী ভোগ করেন? শুধুই একটা পরিবহন ভোগ করেন না নিশ্চয়। একটা মানুষ তার দৈহিক শক্তি খরচ কইরা প্যাডেল মাইরা আপনারে বহন করে নিয়া যাচ্ছে, এই পুরা দৃশ্যটা রিকশাওয়ালার অধঃপতন আর আপনের উচ্চে-আরোহণের ছবি।

রিকশায় চড়ার মাধ্যমে আপনি একই সাথে রিকশাওয়ালারে তুই, তুমি ইত্যাদি ডাকার অধিকার লাভ করেন বলে মনে করেন, এবং তাকে সেইভাবে ডাকেনও। এইটা কোন আইনি অধিকার না হইলেও সামাজিক নিয়ম (নর্ম) যে রিকশাওয়ালা আপনার তুলনায় ছোটলোক। এবং ছোটলোকদের সাথে যেইরকম আচরণ বড়লোকদের করা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন, তেমন আচরণ করার মাধ্যমেই রিকশাওয়ালা ছোটলোক আর আপনে তার তুলনায় বড়লোক হইয়া ওঠেন। রিকশায় চড়ার মাধ্যমে আপনে শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে রিকশাওয়ালার দৈহিক শ্রমের বিনিময়ে একটা যাত্রা খরিদ করেন না, আপনি খরিদ করেন 'স্ট্যাটাস'। রিকশাওয়ালার দৈহিক শ্রম ও আপনার রিকশাহরণ শুধু একটা 'যাত্রা' উৎপাদন করেনা, উৎপাদন করে আমাদের সমাজে হাজির থাকা ক্ষমতা-সম্পর্ক।

এই ক্ষমতা-সম্পর্ক চরিত্রের দিক থেকে সামন্ত ধরণের। আগেরকালে জমিদাররা পালকিতে চড়তো, আপনে রিকশায় চড়েন। আপনার মতো এমন বহু ছোট জমিদার আছে এখন বাংলাদেশে, যারা রিকশাওয়ালাদের সাথে সম্পর্কের বিচারে নিজেরে বড় মনে করেন। এই জমিদার মনোভাবের কারণেই যখন বাসের চাপায় কেউ নিহত হয় তখন পত্রপত্রিকায় ভিলেইন হিসেবে যাদেরকে উৎপাদন করা হয় তারা হইল ছোটলোক বাসচালক আর হেল্পার। তরুণ আবরারের খুনি হিসাবে আরেক তরুণ বাস চালককে আপনারা ডিমোনাইজ করতে পারেন সহজেই। খালি অপরাধী না; এদেরকে আপনাদের দেখাইতে হয় মদ্যপ, অসভ্য, শয়তান হিসেবে। অথচ আপনার প্রতিদিনকার সামাজিক চর্চা, আপনার রাজনীতি আর আপনার ভোগের পদ্ধতির মধ্য দিয়েই মানব জীবনের প্রতি সহানুভূতিহীন ড্রাইভার, হেল্পারদের উৎপাদন হয়।

এই ঢাকা শহরের রাজনৈতিক নেতৃত্বে যারা আছে, বাসের মালিক যারা, তারাতো বড়লোক। তাদের বিরুদ্ধেইতো আপনার আসল লড়াই। সেই লড়াই না করে শুধু শ্রমিকদের ভিলেন বানানোর শ্রেণি রাজনীতি কইরাতো আপনারা জানে বাঁচবেন না, ঢাকারেও বাঁচাইতে পারবেন না। ঐ হেল্পার আর ড্রাইভাররে শ্রেণিশত্রুতো আপনারা অনেক আগেই বানাইয়া ফেলছেন, আপনেরা যারা ছোটলোক থেকে বড়লোক হওয়ার দৌড়ের মধ্যে থাকা ছোট ছোট জমিদার। আমরা বাংলাদেশের ছাত্রসমাজতো টিনএজ লাইফে ক্ষমতার চর্চা প্রথম বাসের হেল্পারদের লগেই করতে শিখি। তরুণ ছাত্রদের পক্ষে দাঁড়াইয়া আপনে ঢাকারে বাঁচাইতে পারবেন কি; যদি তরুণ হেল্পার, ড্রাইভারদের পক্ষেও না দাঁড়ান?

শুধু নিরাপদ সড়কের মধ্যে প্রশ্ন আটকে থাকলে ওভারব্রিজ আর ফ্লাইওভার নির্মাণের লুটপাটের মধ্যেই আপনার আন্দোলন সংগ্রাম নিঃশেষ হয়ে যাবে। ঢাকার টিকে থাকা নির্ভর করবে আমাদের সবার ঢাকার সকল শ্রেণির মানুষকে মর্যাদা দিতে শেখা আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন নাগরিক হয়ে হয়ে ওঠার উপর, ছোট-জমিদারী চর্চার মধ্যে নয়। এইটা শুধু টিকে থাকার প্রশ্ন না। পুরাতন ঢাকার ধ্বংসস্তুপে নতুন ঢাকা গড়ে তোলার প্রশ্ন।

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও গবেষক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0187 seconds.