• ১৪ মার্চ ২০১৯ ১৬:০৮:২৫
  • ১৪ মার্চ ২০১৯ ১৬:৩৪:২১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নক্সী কাঁথার কবির স্মরণে

ছবি : সংগৃহীত


মফিজ ইমাম মিলন :


মানুষের জাগতিক দুঃখের রূপকার, গ্রামবাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজের জীবনপ্রবাহ যিনি উপস্থাপন করেছেন সমান দরদ দিয়ে, তিনি পল্লী কবি জসীম উদ্দীন। যিনি লোকজীবন থেকে সংগ্রহ করেছেন তাঁর কাব্যের উপকরণ।

তাঁর মতো করে গ্রামের আল পথে, ধানখেতে, গ্রামের রোদ-হাওয়া গায়ে মেখে বেদের বহরের হাসি-কান্নায় সুর মেলাতে আর কোন কবি আবার কখনও বাংলায় আসবে কি না তা ভবিষ্যতই বলতে পারে। কেননা, পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে নক্সী কাঁথার মাঠ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে মাটির গন্ধমাখা উদার মন-মানসিকতাও।

নক্সী কাঁথা গ্রাম গ্রামান্তরের নারীর কোমল হস্তের সুচারু শিল্পকর্ম। এটি নতুন অর্থে তাৎপর্যময় হয়েছে জসীম উদ্দীনের কবি হস্তে। একজন নারীর স্মৃতিময় এই নক্সী কাঁথা। কবি মুলত পল্লীর মানুষের জীবনাচরণের কবি হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। পল্লীর লোকগীতি সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি লোকসংগীত, লোকশিল্প ও নক্সী কাঁথার সংগ্রাহক হিসেবেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর লেখা ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থ যেমন বিপুলভাবে পঠিত হয়েছে, তেমনি তাঁর এই কাব্যভিত্তিক নৃত্যনাট্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে। একইভাবে তাঁর রচিত ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বিষয়বস্ত ও লোকজ উপাদানে ভরপুর নিখুঁত জীবনচিত্র যে কোন সংবেদনশীল মানুষের প্রাণ ছুঁয়ে যায়। জসীম উদ্দীন রচিত ‘পূর্ববঙ্গের নক্সীকাঁথা ও শাড়ি’ প্রবন্ধটি তাঁর লোকশিল্পের গভীর পরিচয় বহন করে।

‘ঘরের মেঝেতে সপটি ফেলায়ে বিছায়ে নক্সী-
কাঁথা,
সেলাই করিতে বসিল যে সাজু একটু নোয়ায়ে
মাথা।
পাতায় পাতায় খস্ খস্ খস্, শুনে কান খাড়া করে,
যারে চায় সে ত আসেনাক শুধু ভুল করে করে
মরে।
তবু যদি পাতা খানিক না নড়ে, ভাল লাগেনাক
তার;
আলো হাতে লয়ে দূর পানে চায়, বার বার খুলে
দ্বার।’

শিক্ষাবিদ ও ইতিহাস গবেষক দীনেশচন্দ্র সেন পল্লী অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে পুঁথি সংগ্রহ করতেন। এসব পুঁথি থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সুশৃঙ্খল ও তথ্য সমৃদ্ধ ধারাবাহিক ইতিহাসমূলক গ্রন্থ ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য রচনা’,‘মৈমনসিংহগীতিকা’,‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ সম্পাদনা করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ খোলা হলে তিনিই সে বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এককথায় বলা যায়, দীনেশ সেনই জসীম উদ্দীনকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তিনি কবির নক্সী কাঁথা সম্পর্কে বলেছেন ‘জসীম উদ্দীনের নক্সী কাঁথার মাঠ’ কাব্যখানি পড়িয়া মুগ্ধ হইয়াছি। এ যেন সেই পুরাতন পল্লীকে ফিরিয়া পাইলাম- সেই পল্লীর পথ ঘাট- এ যেন কত চেনা হৃদয়ের দরদ দিয়ে আঁকা। পাড়া গাঁয়ের মেয়ের দুটি ডাগর চোখে,পল্লী রাখালের চোখ জুড়ানো কালো রূপ, মুসলমান লেঠেলদের মারামারি- বাঙালির বিবাহবাসর, গিন্নীর ঘরকন্না এই সকল দৃশ্যে বুক জুড়াইয়া গেল। এই পল্লী-দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ছিল, এখনও হয়ত কিছু কিছু আছে। কিন্তু এ সকল হারাইয়া ফেলিয়াছিলাম। এই হারানো জিনিস নূতন পাওয়ার যে আনন্দ, কবি জসীম উদ্দীন তাহা আমাদিগকে দিয়াছেন। ইনি তরুণ বয়ষ্ক কিন্তু বীর-বিক্রম। ইনি কবিতা রাজ্যে যে পাঠশালা খুলিলেন, তাহা ইহার নিজের আবিষ্কার। জানি না সহরে থাকিয়া কবি তাঁহার এই সবুজ প্রাণ, বঙ্গ জীবনের অতুলনীয় গ্রাম্য সম্পদ- ঘরকন্নার এই সাঁঝের ভোগ হারাইয়া ফেলিবেন কিনা। সর্বগ্রাসী সহরের মায়াজাল কাটাইয়া পল্লীর অনাবিল ভাব ও স্ফূর্তি বজায় রাখা শক্ত।”

জসীম উদ্দীনের প্রথম খন্ড কাব্য ‘রাখালী’র পরে ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বহু প্রশংসাধন্য প্রথম কাহিনী কাব্য ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’। নক্সী কাঁথার মাঠ উৎসর্গ করেছিলেন কবির জীবন পথের বন্ধু আবদুল মজিদ সাহিত্যরত্ন ও আবদুল কাদিরকে। পল্লী পটভূমিতে দুটি গ্রাম্য ছেলেমেয়ের উন্মেষ, বিকাশ ও বিষাদজনক পরিণতির চিত্র এঁকেছেন কবি এ কাব্যে। চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিত একটি ক্ষুদ্র ভূমিকা তরুণ কবির কাব্যেও শিরোভূষণ হিসেবে স্থান পেয়েছিল। ভূমিকায় সমকালীন সাহিত্য রুচির কথা স্মরণ রেখেই অবনীন্দ্রনাথ দ্বিধাভরে বলেছিলেন, নক্সী কাঁথার মাঠ’ রচয়িতা শ্রীমান জসীম উদ্দীন নতুন লেখক, তাতে আবার গল্পটি নেহাতই যাকে বলে ছোট্ট এবং সাধারণ পল্লী জীবনের। শহর বাসীদের কাছে এই বইখানির সুন্দর কাঁথার মতো করে বোনা লেখার কতটা আদর হবে জানি না, আমি এটিকে আদরের চোখে দেখেছি, কেননা এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলার পল্লী জীবনের আমাদের কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে।”

‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ সম্পর্কে সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়- যিনি জসীম উদ্দীনের জীবন ও সাহিত্যকর্ম বিষয়ে পিএইচডি করেছেন- প্রথম কোন বাঙালি মুসলমান কবির ওপর পুণাঙ্গ বই প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন ‘পল্লী জীবনভিত্তিক প্রেমকাব্য নক্সী কাঁথার মাঠে’র নরনারীরা এত আশ্চর্যরূপে জীবন্ত হয়ে আমাদের সামনে ধরা দিয়েছে। নক্সী কাঁথার মাঠে’র এই প্রেমচিত্রে গ্রামবাংলার বাস্তবজীবন দলিলও বটে। কারণ এ কাব্যে কবি দুটি পল্লী বালক-বালিকার প্রেমের উন্মেষ, দৈনন্দিন কর্মধারা, প্রতিদিনকার ঘরকন্নার অতিবাস্তব ও জীবন ছবি এঁকেছেন। তিনি অত্যন্ত নিপুণ ভাবে গ্রাম্য উৎসব-অনুষ্ঠান, গ্রাম্য কলহ, জমিজমা নিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামা, মামলা মোকদ্দমার বর্ণনা দিয়ে আপাত নিস্তরঙ্গ গ্রাম্য জীবনের নাটকীয় উপাদানগুলোকে সবার সামনে পল্লী বৃত্তের মধ্যে সঞ্চরণশীল জীবনের আশ্চর্য এক ব্যাপ্তির আভাস কাব্যটিকে বিধৃত হয়েছে। রূপাই ও সাজুর প্রেম তাই দেশ কালের ভূগোল অতিক্রম করে আমাদের চেতনায় নির্বিশেষ হয়ে দেখা দেয়, যদিও তারা সত্যি সত্যি পল্লীরই সাধারণ মানুষ।

পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে নক্সী কাঁথার মাঠ অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, মুছে যাচ্ছে আল্পনার দিন, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে পুঁথি-পাঠের আসর এবং বিদায় নিয়ে যাচ্ছে এই সব সনাতন ধারার বহু শিল্পী, কবি এবং সাহিত্যিক; এই চিরায়ত সত্যগুলো নতুন করে মনের ভেতর মোচড় খেয়ে উঠলো জসীম উদ্দীনের ৪৩তম তিরোধান দিবসে। কবি আরো বহু-যুগ-কাল বেঁচে থাকবেন গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে। তাঁর অমর আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : মফিজ ইমাম মিলন, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

মফিজ ইমাম মিলন নক্সী

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0217 seconds.