• ২৯ জুলাই ২০১৮ ১২:৫৭:৫৬
  • ২৯ জুলাই ২০১৮ ১৩:০০:০২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টে 'বাংলা' করার দরকার আছে কি?

পশ্চিমবঙ্গ। ফাইল ছবি


শুভাশিস চিরকল্যাণ পাত্র :


ফেসবুক থেকে জানতে পারলাম যে, আজ (২৬-০৭-২০১৮) পশ্চিমবঙ্গের নাম 'বাংলা' করার প্রস্তাব বিধান সভায় পাশ হয়ে গেল। আমি এই প্রস্তাবে খুব একটা খুশী হতে পারিনি। দেশবিভাগের ফলে পুরা বঙ্গের শুধু পশ্চিমাংশ আমরা পেয়েছি বলে আমাদের রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ হওয়াই কাম্য। এখন এই বিষয়ে আমার যা বক্তব্য তা কিছুটা বিশদে বলে বিষয়টি নিয়ে আপনাদের মতামত জানতে চাই।

এই নাম পরিবর্তনের পিছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে তা হল পশ্চিমবঙ্গের বদলে বাংলা নাম হলে সংসদে পশ্চিমবঙ্গের নেতারা আগে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাবেন, কারণ ইংরেজী বর্ণমালায় B বর্ণটি W-এর আগে। আমার মতে এটা নামপরিবর্তনের উপযুক্ত যুক্তি নয়। সংসদে কোন রাজ্যের নেতারা আগে বক্তব্য রাখবেন তা লটারী করে নির্ণয়ের দাবী জানানো যায়। এজন্য রাজ্যের নাম পাল্টানোর দরকার হয় না। আর আমরাই আগে বলব, এমন দাবী করাটাও ভাল নয়। সকলকে বলার সুযোগ দিতে হয়। তবু কে আগে বলবে সংসদে তা নিয়ে সমস্যা (!) হলে লটারী করে বক্তাদের ক্রম নির্ণয় করাই উপযুক্ত সমাধান। আরো একটা কথা হল বিধায়করা এই ব্যাপারে ব্যাকরণবিদ, নিরুক্তকার ও জনসাধারণের মতামত নেন নাই।

আধুনিককালে আমাদের রাজ্যে নানা স্থান ও রাস্তার নামকরণ নিয়ে একেবারে যা তা কাণ্ডকারখানা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আমার সুকুমার রায়ের 'হযবরল'-এর হিজবিজবিজের কথা মনে পড়ে গেল। হিজবিজবিজ বলত যে তার নিজের নাম হল আলুনারকোল, তার শ্বশুরের নাম বিস্কুট এবং বিকেল হলে তার নাম হয়ে যায় রামতাড়ু। সে আরও বলত যে একজন তার জুতার নাম রেখেছিল 'অবিমৃশ্যকারিতা'। এমন নামকরণে সত্যিই অসুবিধা আছে। আসলে ওই ব্যক্তি 'অবিমৃশ্যকারিতা' শব্দটি ভেঙে তার ভিতরের অর্থ নিষ্কাশন করতে পারত না বলেই রেগে গিয়ে নিজের জুতার অমন নাম রেখেছিল। নিরুক্ত চর্চা অমন লোকের সমস্যা সমাধানের উত্তম উপায়।

কোনো সত্তার ঠিক নামকরণ করতে গেলে প্রতিটি নামের ভিতরের মানে বোঝা দরকার। নাম ও নামীর ক্রিয়াভিত্তিক সম্পর্ক থাকে, সেটা বুঝে নামকরণ করা ভাল। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা ব্যাখ্যা করছি। সম্প্রতি সত্যজিতৎ রায়ের বাড়ির পাশের 'বিশপ লেফ্রয় রোড'-এর নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘সত্যজিৎ রায় ধরণী’। এই নাম ‘সত্যজিৎ রায় সরণী’ হলেই ভাল হত। 'নামে কি যায় আসে' বললে চলবে না, নাম ক্রিয়াভিত্তিক হওয়া দরকার। সরণী মানে যা দিয়ে মানুষ সরে সরে যায় (সরণ থেকে সরণী) আর ধরণী মানে যা আমাদের ধরে রাখে। সরণী শব্দটি আসে সরণার্থক সৃ ধাতু থেকে এবং ধরণী শব্দটি আসে ধৃ ধাতু থেকে। ভিন্ন ভিন্ন ধাতু থেকে নিষ্পন্ন এই দুটি শব্দের অর্থ আলাদা। সরণীকে ধরণী বললে তা ব্যাকরণসম্মত হয় না। আলোচ্য রাস্তাটি দিয়ে বরেণ্য বাঙালি শ্রীসত্যজিৎ রায় মহাশয়ের সরণ হত বলে তার নাম ‘সত্যজিৎ রায় সরণী’ হওয়াই বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।

আমাদের রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ উপযুক্তই বটে। অকারণে এই নাম পাল্টানোর দরকার নাই। প্রসঙ্গত, বঙ্গ নামের অর্থ বলি। বঙ্গ শব্দে ব মানে দুই; ঙ মানে রহস্যময়তা এবং গ মানে গমন করা বলে ধরতে হবে। বঙ্গ মানে যা বঙ্ গমন করে। ব মানে যে দুই হয় তা বোঝা যেতে পারে বার, বত্রিশ, বাহান্ন, bicycle ইত্যাদি শব্দগুলো থেকে। যেমন ব ও ত্রিশ মিলে বত্রিশ হয়। ব-এ বহন করাও হয় --- একের পিঠে দুই। গাছেরও খাব, তলারও কুড়ুব। বিজ্ঞান, ধর্ম --- দুই মানব। ব্যক্তি ও সমাজ, পূর্ব ও পশ্চিম, স্বদেশ ও বিদেশ, ক্রিয়াভিত্তিক ও প্রতীকী অর্থ, কোনো মত এবং তার বিপরীত মত --- সবকিছুকেই গুরুত্ব দেব। এই হল বং গমন বা বঙ্গ। প্রসঙ্গত, রাঙ-কে বঙ্গ বলে কারণ তাতে টিন ও সীসা --- এই দুই ধাতু একত্রে থাকে এবং বেগুনকে বঙ্গ বলে কারণ তা লাল ও নীল এই উভয় রঙ একত্রে বহন করে। আমার সুচিন্তিত প্রস্তাব হল West Bengal -এর নাম পাল্টে Paschimbanga (পশ্চিমবঙ্গ) করা হোক। পশ্চিমবঙ্গকে আর 'বেঙ্গল' বলার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। 

বাংলাদেশ পাশেই রয়েছে বলেও আমাদের রাজ্যকে ‘বাংলা’ না বলে 'পশ্চিমবঙ্গ' বলাই ভাল। তাতে বঙ্গভঙ্গের ইতিহাসের স্মৃতিও মর্য্যাদা পায়। বিকল্প হিসাবে রাজ্যের নাম বঙ্গ, ‘বঙ্গভূমি’ বা ‘বঙ্গভূমও’ করা যেতে পারে। এই নামগুলো ইতিহাস ও ব্যাকরণের বিচারে সার্থক ও সুন্দর। কিন্তু সেটা এখনই খুব দরকারি বলে আমি মনে করছি না। West Bengal কে Paschimbanga এবং India-কে Bharat করাটা তার চেয়ে বেশি দরকারি। এখনই পশ্চিমবঙ্গের নাম 'বাংলা' করতে ব্যস্ত হবার কোনো দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না। যদি কখনো পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে অখণ্ড রাজ্য বা দেশ গঠিত হয় তবে তার নাম বঙ্গ বা বঙ্গভূমি রাখার কথা ভাবা যেতে পারে (বাস্তবে সে আশা সুদূরপরাহত)। তবে পশ্চিমবঙ্গ নামটি বাঙালির দেশবিভাগের স্মৃতিকে জাগিয়ে দেয়, যার দরকার আছে।

প্রসঙ্গত, আমাদের দেশের নামের অর্থ বলি। এতে নামের সঙ্গে নামীর সম্পর্কের রসায়নটা কিছুটা বুঝা যাবে। আমাদের দেশের নাম ভারতবর্ষ। যে দেশ পুত্ত্র, প্রজা ও জ্ঞানীদের ভরণপোষনের দায়িত্ব নেয় তাকে ভারত বলে। ভারত শব্দটি আসে ভৃ ধাতু থেকে। ভরণপোষনের জন্য সরকার ভুরি ভুরি সম্পদ বর্ষণ করে বলে দেশটিকে ভারতবর্ষও বলে। রাজ্যের ভরণপোষণ করার জন্যই রামায়ণের ভরতের নাম ভরত হয়েছিল (কৃত্তিবাসী রামায়ণে বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে)। এখানে একথা বুঝে নিতে হবে যে রামায়ণ ক্রিয়াভিত্তিক ভাষায় লিখিত এবং ভরত মানে আসলে ভরণপুঁজি (Subsistence money)। ভরতের অন্নপ্রাশনের সময় দশরথ তার ঐ নাম রেখেছিলেন বলে ভাবলে নামকরণের সার্থকতার কারণ বোঝা যাবে না। আমাদের দেশকে এখন ‘ইণ্ডিয়া’ বলার দরকার নাই। আমার সুচিন্তিত প্রস্তাব হল অবিলম্বে India-এর নাম পাল্টে Bharat (ভারত) করা হোক। ইংরেজীতে দরখাস্ত লেখার সময় আমরা লিখতে পারি ''To the President of Bharat''.

সম্প্রতি কলকাতার মেট্রোস্টেশনগুলোর নামকরণ নিয়ে যা নয় তাই হয়েছে এবং যারা একাজ করেছেন তাদের ব্যাকরণ জ্ঞান ও সাধারণবুদ্ধির অভাব খুব প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়ে গেছে। মেট্রোস্টেশনগুলোর নামের সঙ্গে ঐ জায়গাগুলোর নামের মিল নাই, এর কুফল আমরা ভোগ করছি। অবিলম্বে সমস্ত মেট্রোস্টেশনগুলোর নাম স্থাননাম অনুসারে করা দারকার। তাতে সকলের সুবিধা হবে। সেদিকে নজর না দিয়ে আমাদের বিধায়করা রাজ্যের নাম পাল্টাতে এত তৎপর কেন তা বুঝা গেল না।

আজকাল বাংলা বানান নিয়েও যাতা চলছে। যেমন ধরুণ বর্দ্ধমান বানান ‘বর্ধমান’ লিখলে বৃদ্ধির ব্যাপারটাই থাকে না (বর্দ্ধমান মানে যা বৃদ্ধি পাচ্ছে), তবু এই ভুল বানান চালু হয়ে গেছে। এইসব ব্যাপার নিয়ে কি ভাবছেন বাঙালী কবি, সাহিত্যিক ও বিদ্বজনেরা? রাজ্যে ইংরেজী মিডিয়ামের রমরমা হচ্ছেই বা কেন? এইসব দিকে নজর না দিয়ে রাজ্যের নাম পাল্টাতে আমরা ব্যস্ত হব কেন? 

এখন পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টে 'বাংলা' করার দরকার আছে কিনা সেই ব্যাপারে আপনাদের যুক্তিপূর্ণ মতামত কাম্য।

(লেখক রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ। রচনাটি খসড়া।)

লেখক পেশায় চিকিৎসক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0253 seconds.