• বাংলা ডেস্ক
  • ১২ জুলাই ২০১৮ ১৮:৫৩:০১
  • ১২ জুলাই ২০১৮ ১৮:৫৩:০১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

গণগ্রেপ্তার জনগণকে ভয়ে রাখার বড় কৌশল : চমস্কি

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন : মাদকযুদ্ধকে আপনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। বিষয়টি আসলে কীভাবে সম্ভব?

নোয়াম চমস্কি : আসলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এ বিষয়টি একটি শব্দ মাত্র। আমি এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কেনেডির আমলের রাজনৈতিক দমনপীড়নের সময়কার সাহিত্য থেকে ধার করেছি। তখন এ অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ সেসময় এখানে মানুষের মধ্যে ভয়াবহ আকারে অসন্তোষ ও ক্ষোভ দানা বেঁধে ছিল। এসব মানুষ সমাজিক সব ধরনের পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন জনপ্রিয় বাহিনীকে সমর্থন দেওয়া শুরু করলো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়টিকে মোটেই সহ্য করে না।

আপনি এসব নিম্নস্তরের মানুষকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এর একটি পদ্ধতি হলো, সন্ত্রাস ও সহিংসতার অযুহাত দিয়ে দমনপীড়ন করা। এছাড়া পেট্রোল বোমার বিষয় ছাড়াও অন্যান্য পন্থা তো রয়েছেই। তবে রাষ্ট্র এসবের পাশাপাশি কিছু উন্নয়নমূলক কাজও করে। একইসঙ্গে মানুষকে বশীকরণের জন্য বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে প্রপাগান্ডার অংশ হিসেবে বিভিন্ন সমাবেশও করে। কারণ প্রপাগান্ডা যখন সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন এটি অত্যন্ত কার্যকরী হয়ে ওঠে।

মানুষ যখন তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন অভ্যন্তরীণভাবে আপনি একই সমস্যার সম্মুখীন হবেন।আপনাকে তখন সবকিছু বুঝে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে,বিক্ষোভ করা মানুষের মধ্যে যারা নিশ্চুপ রয়েছে, তারা নিস্ত্রিয়,উদাসীন এবং রাষ্ট্রের একান্ত বাধ্যগত। শুধু তা-ই নয়, তারা কখনোই রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার নিয়ে টু-শব্দ করবে না।এটাই আধুনিক গণতন্ত্রের প্রধান বিষয়বস্তু।পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের বিস্তৃতি হিসেবে স্বাধীনতা ও প্রবৃদ্ধির ধোঁয়া তুলে উছিলা হিসেবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণের দরকার হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট প্রপাগান্ডার মাধ্যমে গণতন্ত্রের উন্নয়নের কম বেশি ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। আর সেটা সরাসরি কোনো রাখঢাক না রেখেই করা হয়। এখানে কোনো ধরনের গোপনীয়তার বিষয় নেই। এটা প্রকাশ্যে ব্যবসা, সাহিত্য এবং সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক জার্নালে খোলাখুলিভাবেই আলোচনা করা হয়। আপনাকে প্রতিনিয়ত এসব মানুষের মনের বিরুদ্ধে তাদের ভাষায় লড়াই করে যেতে হবে। কারণ এরাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় বিষয় আয়োজন করে। এই কৌশল বা সম্মতি উৎপাদনই তাদের ভাষায় গণতন্ত্রের বিষয়বস্তু। কারণ আপনাকে নিশ্চত করতে হবে এখানে অজ্ঞানতা ও অনাধিকার চর্চার কোনো স্থান নেই। তার মানে আমরা সাধারণ মানুষরা কখনোই জনগণের অধিকারের জন্য কাজ করা এসব সিরিয়াস মানুষদের নিয়ে নাগ গলাব না।

প্রশ্ন : কিন্তু এই বিষয়টা আপনি মাদকযুদ্ধের সাথে কীভাবে খাপ খাওয়াচ্ছেন?

নোয়াম চমস্কি : খুব ভালো প্রশ্ন। আসলে প্রথাগতভাবেই আমাদের প্রধান কাজ হলো প্রত্যেক সমাজের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা, এটা সামরিক শাসকের আমলে হোক বা গণতান্ত্রিক সরকারের সময় হোক। কারণ রাষ্ট্র সবসময় এসব সাধারণ মানুষকে ভীত অবস্থায় দেখতে চায়। আর যদি মানুষ ভীত হয়ে যায়, তাহলে তারা কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদেরকে সপে দিবে। একইসঙ্গে বলবে, ‘ঠিক আছে আমার জীবন চালনার জন্য আপনাকেই সব ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। আপনি কেবল আমাকে রক্ষা করুন।’

ফলে এই মাদক ও বিভিন্ন অপরাধের ভয় দেখানো রাষ্ট্রের একটি শাণিত অস্ত্র। একইসঙ্গে এটা একটি ব্যবসা। যদিও ‍যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিচার কমিশন বলে দিয়েছে, পুঁজিবাদী এ সমাজ ব্যবস্থায় এসব অপরাধ কখনোই কমানো সম্ভব নয়। ... অন্যদিকে আমাদের নিজেদের বাঁচাতে এই মাদকযুদ্ধ সমাজের ভয়াবহ বিপজ্জনক মানুষের বিরুদ্ধে চালানো হয়। এটা কথিত ‘ভয়াবহ শ্রেণী’কে নিয়ন্ত্রণের জন্য সরাসরি পরিচালিত হয়। এরা সেইসব অনাহূত লোক যারা প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের মুনাফা অর্জন এবং সম্পদ বৃদ্ধিতে কোনো ধরনের অবদান রাখে না। ফলে তাদেরকে একটু অন্যভাবে দেখে নেওয়ার দরকার পড়ে।

প্রশ্ন : অন্যান্য দেশের অবস্থাও কি একই রকম?

নোয়াম চমস্কি : অবশ্যই। তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব মানুষকে মেরে ফেলে না। তারা জেলে পুরে রাখে। ... কারণ রাষ্ট্রীয় ভাষায় বিশাল সংখ্যক এসব মানুষ কার্যত অনিরাপদ, বিভিন্ন দুর্দশায় জর্জরিত অথবা এ দুটোর মাঝামাঝি কোনো একটি। এসব মানুষকেই সাধারণত গ্রেফতার করা হয়। আসলে মাদকযুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য আতঙ্ক ও প্রোপাগাণ্ডা দিয়ে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা

প্রশ্ন : এটা হয়তো একেবারেই সত্য, কিন্তু আপনি সেটা কীভাবে প্রমাণ করবেন?

নোয়াম চমস্কি : আপনি শুধু মাদকদ্রব্য হিসেবে দেখা গাঁজার দিকটাই দেখুন।  ৭০ এর দশকের শেষ দিক থেকে এটা সর্বাধিক ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু তখন এটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়নি। আপনাকে গাঁজা সেবনের জন্য তখন জেলেও যেতে হয়নি। কারণ মানুষ তখন এটাকে বড় লোকের সন্তানদের মত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবেই দেখে এসেছে। ... কিন্তু ৮০ দশকে এসে ঘোষণা করা হল, নানা গবেষণা করে পাওয়া গেছে এটা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। গাঁজার সাথে সাথে সিগারেট, অ্যালকোহল, লাল মাংস, কফিসহ নানা কিছু এ খাতে যোগ করা হল। কিন্তু এটার দায় এসে পড়লো গরীবদের উপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের গরীব ও কালো মানুষরা এটা শিকার হল। কারণ তাদের কোনো পরিচয় ছিল না, তারা ছিল ছিন্নমূল।

সুতরাং এই বাজারি প্রবণতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যখন রাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধের কথা বলছে, তখন আপনাকে সহজেই বুঝে নিতে হবে এর মাধ্যমে কেবলই কালো খেটে খাওয়া মানুষগুলোকেই তুলে আনা হবে। আপনি কখনোই দেখবেন না কোনো ধনী সাদা চামড়ার মানুষকে তুলে আনতে। কারণ তাদেরকে কখনোই গ্রেফতার করে আনা হবে না। আর আমার মত যারা একটু উচ্চ মধ্যবিত্ত রয়েছে তাদেরকে তো না-ই। যদি এদের কেউ বাড়িতে বসে কোকেনও গ্রহণ করে তাহলে পুলিশ কখনোই তার বাড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করবে না। সুতরাং এসব গরীব মানুষের বিরুদ্ধে চালানো মাদকযুদ্ধের অনেক কারণ রয়েছে। আসলে রাষ্ট্রের এসব চালু রাখতেই হয়। ...

প্রশ্ন : বাড়ি থেকে গণগ্রেফতারের বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

নোয়াম চমস্কি : ... এটা জনগণকে ভয়ে রাখার একটি বড় কৌশল। আমরা কেবল চীনের কারাগারে শ্রমিকদের কঠোর শ্রম নিয়ে লাফালাফি করি, কিন্তু এটা তো আমাদের দেশেই অব্যাহত রয়েছে। এই শ্রম খুবই সস্তা, এর জন্য তাদেরকে কোনো ধরনের সংগঠিত করার দরকার পড়ে না। এসব শ্রমিকরা কখনো নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলে না। রাষ্ট্রকে কখনোই তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত হতে হয় না। কারণ জনগণই সবকিছুর জন্য টাকা দিচ্ছে। এটাকে নির্দিষ্ট ‘নমনীয়’ শ্রমিক দল বলা যায়। অর্থনীতিবীদদের ভাষায় বলা যায়, যখন আপনার দরকার তখন শ্রমিকদের আপনি ইচ্ছে মত ব্যবহার করুন, যদি দরকার না পড়ে তাহলে তাদেরকে ছুঁড়ে ফেলুন।

প্রশ্ন : তাহলে কি আপনি মাদক বৈধতার পক্ষে?

নোয়াম চমস্কি : কেউ জানে না মাদকের বৈধতা দিলে এর পরিণতি কী হবে। যারা বলছে পরিণতি ভয়াবহ হবে তারা হয় বুদ্ধিভ্রষ্ট কিংবা মিথ্যা বলছে। কারণ এটা কেউই সঠিকভাবে বলতে পারবে না। তার মানে এটার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। একইসঙ্গে এর পরিণতি দেখার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে কিছুদিন দেখাও যেতে পারে।

অধিকাংশ কোমল মাদকের ইতোমধ্যে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অ্যালকোহল ও তামাকজাতদ্রব্যের মাদক। কিন্তু মানসিক চিকিৎসকদের মতে এই তামাকজাত মাদকই সবচেয়ে বেশি মানুষ মেরে ফেলে। তারপর অ্যালকোহল তারচেয়ে একটু কম মানুষকে মারে। কারণ এই অ্যালকোহল খেয়েই অধিকাংশ মানুষ সহিংসতায় জড়ায়। এই অ্যালকোহল ও তামাকের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে ১০ থেকে ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। যেগুলোর অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়।

তবে জেনে রাখা ভালো, গাঁজা কিন্তু ততটা ক্ষতিকর হিসেবে পরিচিত নয়। আমি হয়তো সাধারণভাবেই বলতে পারি এটা আপনার জন্য ভালো না। কিন্তু কফি তো আপনার জন্য উপযোগী না, চা, চকলেটও আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু কফি পান করাকে অপরাধের মধ্যে আনা এক ধরনের পাগলামি হবে, যদিও এটা ক্ষতিকর।

১৯৯৮ সালের এপ্রিলে আমেরিকান ভাষাবিদ, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, সমালোচক ও রাজনৈতিককর্মী নোম চমস্কির সাক্ষাৎকারটি নেন নিউইয়র্কভিত্তিক প্রকাশিত মাসিক ম্যাগাজিন হাই টাইমসের সাংবাদিক জন ভেইট। সাক্ষাৎকারটি নোম চমস্কি ডট ইনফো থেকে নিয়ে বাংলা ডট রিপোর্টের পাঠকদের জন্য সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশ করা হয়েছে। ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করেছেন ইব্রাহীম খলিল।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0230 seconds.