• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৯ জুন ২০১৮ ১৮:৫৭:৪৪
  • ২৯ জুন ২০১৮ ১৯:৩৯:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

‘মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়েই নির্বাচন করবো’

ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী। ফাইল ছবি

মনীষা চক্রবর্তী। কয়েক বছর আগে এমবিবিএস পাশ করে ডাক্তার হয়েছেন। তবে হাসপাতালে নয় এখন তিনি রুগী দেখছেন পথে ঘাটে, বস্তিতে...। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের রাজনীতির সাথে যুক্ত মনীষা রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমে রোগীও দেখেন। তবে রোগীদের কাছ থেকে এর বিনিময়ে টাকা নেন না।

তরুণ এ চিকিৎসক বাসদের পক্ষ থেকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন করছেন। ইতোমধ্যে নির্বাচনী মাঠে সাড়া ফেলেছেন মনীষা। শৈশব থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত মনীষা এখন প্রতিশ্রুতিশীল রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবেও বেশ পরিচিতি পেয়েছেন বরিশালের মানুষের কাছে। র্শীষ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীর পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে তার নামও। নির্বাচনের মাঠে যে কালোটাকার ছড়াছড়ির অভিযোগ ওঠে তার বিপরীতে ব্যতিক্রমী প্রচরণা করছেন এই প্রার্থী। মাটির ব্যাংকে নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছেন সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে। রিকশা শ্রমিক থেকে শিক্ষক তারাই বহন করবে তার নির্বাচনী খরচ। প্রচারণার স্লোগানেও তারা বলছেন- ‘ভোট এবং ভোটের খরচ যুগিয়ে জনগণের পক্ষের সৎ-যোগ্য-নীতিবান প্রার্থীকে নির্বাচিত করুন’

বাবা এডভোকেট তপন চক্রবর্তী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে মনীষা ছাত্র অবস্থায় বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন ও পরে বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন। সুন্দরবন আন্দোলনসহ জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে একজন সক্রীয় সংগঠক-কর্মী হিসেবেও পরিচিতি। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, ভোট লড়াই, র্শীষ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীর সাথে কীভাবে ভোটের লড়াই চালাবেন এসব বিষয়ে মনীষা কথা বলেন বাংলা’র সাথে। মনীষা চক্রবর্তীর সেই স্বাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো।

বাংলা : এবারইতো আপনি প্রথম কোনো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন?
মনীষা চক্রবর্তী : হ্যা, এবারই প্রথম নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।

বাংলা : কেন আপনি নির্বাচন করতে চাইছেন?
মনীষা চক্রবর্তী : বাংলাদেশের রাজনীতি আজ লুটেরা ও দুর্বৃত্তদের দখলে। আমরা মনে করি, এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে পাওয়া স্বাধীন দেশে স্থানীয়-জাতীয় সকল ক্ষেত্রে জনগণের ক্ষমতায়ন হওয়ার কথা ছিল। অথচ জনগণ ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে। জনগণের স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে ও জনগণকে ক্ষমতার কেন্দ্রে রেখে দুর্নীতি-লুটপাট-দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির রাহুগ্রাস থেকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বাসদের পক্ষ থেকে আমরা নির্বাচন করছি।

বরিশাল বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শহর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বরিশালের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতেও বরিশাল ছিল অগ্রসর। অশ্বিনীকুমার দত্ত, মুকুন্দ দাস, জীবনানন্দ দাশ, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক, আরজ আলী মাতুব্বর, আলতাফ মাহমুদ, আবদুল লতিফ ছিলেন বরিশালের কৃতি সন্তান। অথচ এক সময়ের জ্ঞানে-গুণে-সম্পদে সমৃদ্ধ বরিশাল আজ অন্যান্য নগরীর চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে আছে। বরিশালের সেই গৌরবময় অতীতকে ফিরিয়ে এনে আমরা বরিশালকে আরো অগ্রসর করে নিয়ে যেতে চাই। শিক্ষায়-স্বাস্থ্যে-কর্মে-সম্পদে বরিশালকে আমরা গড়ে তুলতে চাই এক অনুকরণীয় নগরী হিসেবে।

বাংলা : আপনিতো সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে জড়িত। বিদ্যমান কাঠামোতে নির্বাচিত হলেও সত্যিকার অর্থেই জনগণের সিটি কর্পোরেশন তৈরি করা কতটুকু সম্ভব?
মনীষা চক্রবর্তী : বরিশালের গণমানুষের পক্ষে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গণদাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম করছি। জনগণের আস্থার উপর ভিত্তি করে নির্বাচিত হলে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত হবে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে 'নগর কাউন্সিল' এর মাধ্যমে। সমস্ত উন্নয়ন কাজ মানসম্মত ও দুর্নীতিমুক্ত করতে মনিটরিং সেল গঠন করে তা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে। বিদ্যমান দুর্নীতিগ্রস্থ লুটপাটের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে আমাদের মূল শক্তি হবে জনসম্পৃক্ততা। জনগণের স্বার্থে সিটি কর্পোরেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থায় বাধার সম্মুখীন হলে জনগণকে সাথে নিয়েই আমরা বাধা প্রতিরোধ করব।

বাংলা : বৈষম্যহীন সমতার যে রাজনীতির কথা বলেন- আপনি নির্বাচিত হলে কী সে ধরনের নাগরিক সেবা উপহার দেয়া সম্ভব?
মনীষা চক্রবর্তী : বরিশালের ক্ষেত্রে দরিদ্রতার একটি বড় কারণ হল কর্মসংস্থানের অভাব। বিভাগীয় শহরে কোনো বড় শিল্প এলাকা বা কলকারখানা না থাকায় এই বিভাগে বেকারত্ব ও দারিদ্রতা অত্যন্ত প্রকট। নির্বাচিত হলে বরিশালের গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নিয়ে গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা নির্মাণ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার উদ্যোগ নেয়া হবে। একইসাথে বিভিন্ন বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নে বিদ্যুৎ, পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা ও বস্তিবাসী নারীদের মধ্যে মাঝারী ও কুটিরশিল্প প্রসার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা মনে করি, জনগণের বৃহত্তর অংশের স্বার্থে গৃহীত এসব কর্মসূচি নিয়ে জনগণের মধ্যে উপলব্ধি তৈরি করতে পারলে আমরা সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনার এসব সেবা জনগণকে দিতে সক্ষম হব।

বাংলা : আমরা বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ শুনতে পাই বিরোধী রাজনীতি করা কেউ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে তাকে সরকারে পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয় না। আমরা ধরে নেই আপনি নির্বাচিত হলে আপনার ক্ষেত্রেও তেমন অসহযোগিতা করা হবে। সে ক্ষেত্রে কীভাবে আপনি নাগরিক সেবা দিবেন?
মনীষা চক্রবর্তী : আমরা মনে করি, সিটি কর্পোরেশন বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান চালানোর ক্ষেত্রে প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত জনগণের মতামত। সে কারণেই সিটি কর্পোরেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের 'নগর কাউন্সিল' গঠন করার পরিকল্পনা আছে। বরিশালে গ্যাস সরবরাহসহ সামগ্রিক গণদাবি নিয়ে জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছি। নির্বাচিত হলেও এই সকল আন্দোলন আমরা জারি রাখব। সে কারণেই সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার অসহযোগিতা বা অন্যায়ের সম্মুখীন হলে আমরা জনগণকে সাথে নিয়েই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।

বাংলা : আপনারা নির্বাচনী ব্যয় কিভাবে বহন করছেন? 
মনীষা চক্রবর্তী : নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর জন্য আমরা মাটির ব্যাংকের মাধ্যমে জনগণ শুভাকাঙ্খীদের কাছ থেকে তহবীল সংগ্রহের আহ্বান রেখেছি। আমরা বিভিন্ন রিকশা গ্যারেজ, হোটেল, বাসাবাড়িতে নির্বাচনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে দুই শতাধিক মাটির ব্যাংক রেখেছি। সেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসছে, নিজ উদ্যোগে আর্থিক সাহায্য করছে। শুভাকাঙ্খিরা তাদের সাধ্য মত এগিয়ে আসছেন।
এছাড়া আমাদের সংগঠনের প্রকাশনা বিক্রির মাধ্যমেও নির্বাচনের জন্য অর্থ সংগ্রহ শুরু করেছি।

বাংলা : মাটির ব্যাংকের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের বিষয়ে একটু বলুন এবং জনগণ এতে কিভাবে সাড়া দিচ্ছে?
মনীষা চক্রবর্তী : ‘নির্বাচন মানেই টাকার খেলা’- এ ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত। কালো টাকা আর পেশী শক্তির দাপটে নির্বাচন আজ অনেকের কাছেই ব্যবসার আরেক নাম। কিন্তু আমরা মনে করি নির্বাচনে যারা কালো টাকার প্রদর্শনী করেন, তারা জনগণকে কিছু দেয়ার অভিপ্রায় রাখেন না। বরং জনগণের পক্ষে যিনি নির্বাচন করবেন, সেই মানুষের নির্বাচনের অর্থ জনগণেরই বহন করা উচিত। এটাই হওয়া উচিত গণমানুষের নির্বাচনী সংস্কৃতি যা জনপ্রতিনিধির মধ্যে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করবে। তাই আমাদের নির্বাচনী স্লোগান- ‘ভোট এবং ভোটের খরচ যুগিয়ে জনগণের পক্ষের সৎ-যোগ্য-নীতিবান প্রার্থীকে নির্বাচিত করুন, আপনার বিবেককে রক্ষা করুন।’

গত ডিসেম্বর মাসে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষণার পরপরই আমরা নির্বাচনের ব্যয় নির্বাহের জন্য নগরীর বিভিন্ন হোটেল, রিক্সা গ্যারেজ, বাসা বাড়িতে প্রায় ২ শত মাটির ব্যাংক সরবরাহ করি। নগরীর শ্রমজীবী মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী, মধ্যবিত্ত সাধারন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের এই ব্যাংকগুলিতে টাকা জমা দিতে থাকে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এই মাটির ব্যাংক থেকে, নির্বাচনী প্রকাশনার উদ্বৃত্ত মূল্য থেকে ও বিভিন্ন সমর্থক- শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে ইতোমধ্যে আমরা লক্ষাধিক টাকা সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছি। এটা একদিকে আমাদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে, আরেকদিকে জনগণের উপর আরো আস্থা তৈরি করেছে।

বাংলা : সাম্প্রতিক সময়ে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলো দেখে এবং সার্বিক দিক বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আপনি কতটা আস্থাশীল? আপনার কী মনে হয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব?
মনীষা চক্রবর্তী : সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচন দেশবাসীর মত আমাদেরকেও হতাশ করেছে। এই ধরনের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন- নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বিরাট ব্যর্থতার পরিচায়ক বলে আমরা মনে করি। একইসাথে আমরা মনে করি জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়া গণতন্ত্রের উপর এই ধরনের নগ্ন আঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলার চেষ্টা করব।

বাংলা : মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও সরকারি চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেননি। এর কারণ কি?
মনীষা চক্রবর্তী : বাসদ এর রাজনীতি করতে গিয়ে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ জীবন সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়েছে। সমাজের শিরায় শিরায় মিশে থাকা মুনাফালোভী দুর্নীতিবাজ ব্যবস্থার ব্যাধির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। সেকারণেই সরকারের অনুগত একজন পেশাজীবী চিকিৎসক হওয়ার চেয়ে নষ্ট সমাজের চিকিৎসা করার দায়িত্বটি আমার কাছে অনেক বেশি অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

বাংলা : আপনাকে ধন্যবাদ।
মনীষা চক্রবর্তী : আপনাকেও ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0236 seconds.