• ১৪ মার্চ ২০১৮ ১৯:৩৩:০০
  • ১৫ মার্চ ২০১৮ ১৯:১২:২০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

কোটার পরাধীনতা থেকে মুক্তি মিলবে কবে?

শিক্ষা অধিকার চত্বরে কোটা বিরোধী মিছিলে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। ছবি : সংগৃহীত

মার্চ পেরোচ্ছি আমরা। সামনেই ২৬ মার্চ। এসময়গুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের উত্তাল ইতিহাসের অংশ। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে বহু ধরনের পরাধীনতার জিঞ্জিরে আটকা পড়ছে দেশটি এবং তার ভবিষ্যত। একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ছিল সাম্য, সমতা ও বৈষম্য কমিয়ে আনার চেতনা। কিন্তু সেটা ক্রমে বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে এখন। বিশেষ বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণী-গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ন্যায্যতা দিয়েই।

সম্প্রতি দেশজুড়ে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হচ্ছে। বিশেষত তরুণদের মাঝে। তাদের জন্য এ আরেক পরাধীনতার জিঞ্জির। কোথাও ন্যূনতম দাঁড়ানোর সুযোগ পেলেই তরুণ-তরুণীরা ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে- কোটা ব্যবস্থার অবসান চায় তারা। এই ব্যবস্থা তাদের সম্ভাবনা সীমিত করে ফেলেছে।

শিক্ষা, চাকুরিসহ বহু পরিসরে বহু রূপে কোটা ব্যবস্থা এখন। এটা আরও বাড়ছে। এরকম দৃশ্য চরম অমানবিক যে, একজন ভর্তি পরীক্ষার্থী মেধা তালিকায় অনেক উপরে থেকেও ভর্তি হতে পারছে না, কিন্তু পিতা-মাতার কোন বিশেষ পরিচিতিকে পুঁজি করে তালিকায় নিচে থাকা আরেকজন দিব্যি এমন বিষয়ে ভর্তি হতে পারলো, যা তার যোগ্যতায় অধরা ছিল। শেষোক্ত একই শিক্ষার্থী চাকুরি বাজারেও একইভাবে পারিবারিক মর্যাদাচিহ্ন কাজে লাগিয়ে এগিয়ে গেল। পরিশ্রম করে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকে নজরকাড়া ফলাফল করা সতীর্থটি সে-ই যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই পিছিয়ে পড়লো, তার যোগ্য জায়গাটি আর পেলোই না সে এই সমাজে।

যদিও তরুণ-তরুণীরা সোচ্চার মূলত জাতীয় কোটার অন্যায্যতা নিয়ে, কিন্তু পাশাপাশি এখন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নীরবে আরও বহু কোটা যুক্ত হচ্ছে। যার মধ্যে আছে মন্ত্রণালয় কোটা, ভাই-বোন কোটা, এলাকা কোটা, শিল্পী কোটা ইত্যাদি।

বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ বিশেষ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য কোটা রাখতে হচ্ছে। অনেক উচ্চ বিদ্যাপীঠে ‘এলাকার ছেলে-মেয়েদের জন্য’ কোটা থাকে। কোথাও কোথাও গ্রামকোটা আছে! ‘ক্ষতিগ্রস্ত কোটা’ও একটা পুরানো সুবিধার নাম। আদিবাসী কোটার কথা অনেকে শুনেছেন। অ-আদিবাসী কোটার কথাও জানলাম সম্প্রতি।

একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বাংলাদেশে প্রায় দুই শতাধিক কোটা ব্যবস্থার উপস্থিতির কথা জানিয়েছে। রাজধানীর নিকটবর্তী দেশের নামকরা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটার মাধ্যমে প্রতিবছর ভালো বিভাগগুলোতে ১৫-২০ জন শিক্ষার্থী সুযোগ পাচ্ছে, ভর্তি পরীক্ষায় যাদের অবস্থান থাকে অনেক তলানিতে।
জাতীয় পর্যায়ে চাকুরির ক্ষেত্রে কোটার হিসাব এখন নিম্নরূপ: মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, নারীকোটা ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী কোটা ১ শতাংশ। অর্থাৎ সিংহভাগ আসন এখন কোটাধারীদের দখলে যাচ্ছে। মাত্র ৪৫ শতাংশ আসন থাকছে মেধাভিত্তিক বাছাইয়ের জন্য। অর্থাৎ প্রশাসনের কোন একটি শাখায় যদি প্রতি বছর ১০০ জন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে ১০ বছর পর দেখা যাবে সেখানে ৪৪০ জন হবেন মেধাকোটায় নিযুক্ত কর্মকর্তা আর ৫৬০ জন হবেন মেধা বহির্ভূত কোটায়। মেধা কোটায় নিযুক্তরা স্পষ্টত ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়ে পড়তে বাধ্য। এর সঙ্গে যদি নিয়োগ দুর্নীতির বিষয়টি বিবেচনা করা হয় তাহলে বাংলাদেশ স্থায়ীভাবেই ভিন্নপথে এগিয়ে গেছে বহু আগে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদগুলোতে মেধাভিত্তিক তালিকাভুক্তদের জন্য কোটার হার আরও কম, ত্রিশ শতাংশের মতো। এরই ফল বোধহয়, কোটার পক্ষে এখন জাতীয় পর্যায়ে বেশ যুক্তি-তর্কও দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ বৈষম্য ও অন্যায্যতার পক্ষে একটা বৈধতার পরিবেশ ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।

বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ১০০ ভাগ বিশেষ কোটাভিত্তিক নিয়োগ পরীক্ষারও আয়োজন করেছে। সেখানে কোটারূপী ভাগ্যতিলকের বাইরের কারো প্রার্থী হওয়ারই সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ মেধার উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন দেখার পরিসর এদেশে কমে যাচ্ছে। এ যেন এক অভিশাপ।
কিন্তু এরকম অভিশাপে কী কেবল সংশ্লিষ্টরাই পুড়ছে নাকি দেশের ভবিষ্যতও পুড়ছে? প্রশ্নফাঁস, মূল্যায়ন পদ্ধতির নিম্নমান, দুর্নীতির মতোই কোটা ব্যবস্থা পদ্ধতিগতভাবে বাংলাদেশের সর্বনাশ করছে কি না সেটা গুরুতর এক ভাবনার বিষয় বৈকি। যে ব্যক্তি যোগ্য হয়েও রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা অধিকারে পিছিয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত, তার মাঝে যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের আগুন চিরদিন প্রজ্জলিত হতে থাকবে সেটা কতটা খেয়াল রাখছে দেশ? তার কাছ থেকে এই দেশ কী ধরনের মনোভাব আশা করছে ভবিষ্যতে? তার প্রতি যে অন্যায় করা হলো তার প্রতিকার কী?

কোন বিশেষ জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ লিঙ্গকে, বিশেষ জেলাকে মর্যাদা বা মদদ দেয়ার অর্থ এটা হতে পারে না, দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যকে পদ্ধতিগতভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিতে হবে।

কোটার আলোচনায় বিশেষভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রসঙ্গ চলে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ প্রায় পাঁচ দশক হতে চললো। এর মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের তরফ থেকে বহুবিধ রাষ্ট্রীয় টানাপোড়েনের মাঝেও যত সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে তা যে মোটামুটি সন্তোষজনক খোদ মুক্তিযোদ্ধারাই সেটা এখন স্বীকার করেন। বিশেষ প্রয়োজনে এইরূপ সম্মান-সুবিধা আরও বৃদ্ধিতেও কারো ভিন্নমত থাকবে বলে মনে হয় না। এইরূপ পরিবারের জন্য কোটা নির্ধারণ করতে হলে তাকেও একটা যৌক্তিক পদ্ধতির উপর দাঁড় করানোই সঙ্গত হবে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সংখ্যা পুরো জনসংখ্যার কত শতাংশ সেটা বিবেচনা করা যেতে পারে এক্ষেত্রে।

মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এক সুখী-সমৃদ্ধ-বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। পরিশ্রমী, মেধাবীদের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেশের দায়িত্বশীল পদে না বসালে বাংলাদেশকে গড়ে তুলবে কারা?

‘সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা’ শীর্ষক সংবিধানের ২৯ ধারায় অতি স্পষ্ট করে বলা আছে: ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ একই ধারায় অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না বা সেক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’
এর পরও কোটাপদ্ধতি যে চালু রয়েছে, স্পষ্টত তা অসাংবিধানিক। অবিলম্বে তাই কোটাপদ্ধতি নিয়ে পুনর্ভাবনা দরকার।

এটা সত্য, সংবিধানে দেশের অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাসুলভ বিশেষ বিধানের সুযোগ রয়েছে এবং এও সত্য, কোটা বিশ্বের অনেক দেশেই নানান রূপে আছে। কিন্তু চিরস্থায়ীভাবে কোটা ব্যবস্থা থাকার নজির বিরল। অনেক দেশেই এমন নিয়ম রয়েছে কোটা ব্যবস্থা থেকে কোন ব্যক্তি বা একটি পরিবার একবারের বেশি সুবিধা পেতে পারে না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপর কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোটার প্রবর্তন করা হয় রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে নয়, দারিদ্র্য ও পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে। কিন্তু এখন খোদা কোটা ব্যবস্থাই দারিদ্র্য ও বঞ্চনার বড় উৎস হয়ে উঠছে। কোটা ব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতো আর দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পাচ্ছে না বলে প্রায়ই মন্তব্য শুনতে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে।

কোন জনগোষ্ঠীকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কোটা সুবিধা দেয়ার মতোই জেলাকোটা এবং নারীকোটার পক্ষেও এখন আর দৃঢ় যুক্তি পাওয়া মুশকিল। রাজধানীর বাইরে অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোর জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোগত বাড়তি বিনিয়োগ। একমাত্র এ পথেই সেখানে অগ্রগতি নিশ্চিত হয়। কোন গবেষণা থেকে এমন বার্তা পাওয়া যায় না, কোটা সুবিধা দিয়ে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর মানুষদের এগিয়ে থাকা জেলাগুলোর মানুষদের সমান পারদর্শী করা গেছে। তাছাড়া জেলা সংখ্যা ১৯ থেকে বাড়তে বাড়তে এখন ৬৪ হয়েছে। অনেক চাকুরি বিজ্ঞাপনে পদের সংখ্যাই থাকে এর চেয়ে কম। সেক্ষেত্রে কোটার হিসাব এক জটিল রূপ নেয় এবং তাতে বঞ্চনা হিসাব-নিকাশ আরও করুণ হয়ে ওঠে।

বহু আগে নারীদের জন্য কোটা নির্ধারিত হয়েছিল তাদের পিছিয়ে পড়া অবস্থা দেখে। কিন্তু নারীরা এখন শিক্ষায় আর পিছিয়ে থাকা কোন সামাজিক বর্গ নয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এখন উজ্জ্বল। পেশাজীবনে আগ্রহী নারীরা এখন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন আবাসন সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, পুরুষতান্ত্রিক মনোবৃত্তি ও মজুরি বঞ্চনা আকারে। এরূপ ক্ষেত্রে কোটা কোন সমাধান নয়, বরং প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক পদেক্ষপ। এমনকি পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও স্থানীয়দের দাবি মুখ্যত প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন, নিরাপত্তাহীনতার অবসান, ভূমির সুরক্ষা, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ইত্যাদি। এসব নিশ্চিত হলে কোটার তাগিদ আরও কমে আসবে। ফলে সর্বোত্তভাবেই কোটা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।

লেখক ও সাংবাদিক

 

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0186 seconds.