• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ১৮ অক্টোবর ২০১৭ ১৯:২৬:৫৬
  • ১৮ অক্টোবর ২০১৭ ১৯:৩৬:২৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

‘ইচ্ছা শক্তি থাকলে অনেক কিছু সম্ভব’

আহসান পারভেজ খন্দকার। ফাইল ছবি

আহসান পারভেজ খন্দকার। ভিনি কসমেটিক্সের বাংলাদেশ, নেপাল ও মিয়ানমার- এ তিন দেশের কান্ট্রি হেড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কর্পোরেট জগতের এমন গুরুত্বপূর্ণ আসনে নিজেকে পৌঁছাতে তার কম সংগ্রাম করতে হয়নি। জীবনের বাক বদলের খেলায় কখনো কখনো হোঁচট খেলেও তাকে লড়তে হয়েছে শক্ত হাতে। বাধা এসেছে তবে থেমে যাননি। তার এই সংগ্রামের বিজয়ী যাত্রা আগামীর নেতৃত্বকেও প্রেরণা যোগাবে। বাংলা ডট রির্পোটের সাথে এক আড্ডায় উঠে এলো সেই সব সংগ্রামের গল্প।

আহসান পারভেজ খন্দকারের জন্ম ১৯৭৭ সালের মে মাসে যশোর জেলায়। বাবা ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তা আর মা স্কুলের শিক্ষিকা। ৫ বোনের একমাত্র ভাই আহসানের ছোটবেলা কেটেছে খুলনায়। খুলনার সেন্ট জোসেফ স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং আজমখান কমার্স কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। পরে ঢাকায় এসে ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে আন্ডারগ্রেজুয়েট শেষ করে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে এমবিএ শেষ করে দেশে ফিরে আসেন।

আলোচনা আড্ডায় শৈশবের কথা বলতে গিয়ে মৃদু হেসে আহসান জানান, ছোট বেলায় তার প্রতি পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ ছিলো আহসান পড়াশোনায় মনোযোগী না। পাঠ্য বইয়ের চেয়ে খেলাধূলা আর আড্ডা নিয়েই সময় কাটতো তার। তাই ক্যারিয়ার নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় ছিলো পরিবারের সদস্যরা। তবে সেই শঙ্কা কাটিয়ে কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সেই গল্পই শুনিয়েছেন তিনি।

বাংলা : আপনি এক সময় সরকারি চাকরি করতে চাইতেন। সেটা কি পরিবারের ইচ্ছায়?

আহসান পারভেজ খন্দকার: না আমার বাবা আমার যখন ১৫ বছর বয়স তখনি মারা যান। এরপর মায়ের শাসনেই মানুষ হয়েছি। আর মা কখনই আমাকে এমন কিছু বলেননি। তিনি সবসময় আমাকে বলেছেন ভালো কিছু করতে। তবে এক সময় সবাই চায় সরকারি চাকরি করতে সে হিসেবে আমারও তেমন একটা ইচ্ছা ছিলো আরকি।

বাংলা : এই অবস্থানে আসার পেছনে আপনার শুরুটা বলেন...

আহসান পারভেজ : অন্য অনেকের মত আমিও এ অবস্থানে আসতে গিয়ে অনেক সংগ্রাম করেছি। কষ্ট করেছি। আমি পড়াশুনার পাশাপাশি টিউশনি করেছি। আমি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াটা অনেক ব্যয়বহুল তাই নিজেও চেষ্টা করেছি কিছু করার। মূলত আমি উচ্চ মাধ্যমিকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। তবে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তির্ণ হতে পারিনি। তারপর চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেই এবং সেখানে চান্স পেলাম।  কিন্তু সেশন জট ও অনান্য সমস্যা থাকায় পরিবার থেকেও রাজি হয়নি।
পরে আমি ইস্টওয়েস্টে পড়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখন আমার মধ্যে একটা চিন্তা আসে আমারও কিছু একটা করা উচিত। আসলে আমার নিজের প্রতি নিজের কনফিডেন্স ছিলো, পাশাপাশি পরিবারের সমর্থনও আমার আজকের এ জায়গায় আসার পিছনে অনেক বেশি কাজ করেছে।

বাংলা : নিজের প্রতি এই কনফিডেন্স কি করে এলো?

আহসান পারভেজ : আমি মনে করি ইচ্ছেশক্তি থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব। ইচ্ছেশক্তি,নিজের উপর আস্থা,সততা থাকলে ভালো জায়গায় নিজেকে দাড় করানো অসম্ভব নয়।

বাংলা : ইস্টওয়েস্টে পড়া অবস্থাতে কিছু করার কথা ভাবছিলেন ?

আহসান পারভেজ : ইস্টওয়েস্ট পড়ার সময় আমি স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকে ইন্টার্নি করি। তারপর আমি একটা আইটি ফার্মে যোগ দেই। সেখানে আমি এক বছর কাজ করি। তারপর আমি চিন্তা করি আমার আরো পড়া উচিত। পরিবারের সাথে পরিকল্পনা করে দেশের বাহিরে (ইউকে) চলে যাই পড়তে। এরপর ২০০৪ সালে দেশে ফিরে আমি নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেড এ জয়েন করি। সেখানে আমি সেলস ডিপার্টমেন্টে জয়েন করি। সেখানে আমি প্রায় নয় বছর কাজ করে সেখান থেকে আমি অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠানে চলে যাই।

বাংলা : একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কারণ কি ছিলো?

আহসান পারভেজ : দেখেন নেসলে বাংলাদেশ অনেক ভালো প্রতিষ্ঠান। যেখানে একজন কর্মীকে তারা সলিট ফাউন্ডেসন তৈরী করে দেয়। সত্যি অনেক ভালো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একটা সময় আসে যখন ক্যারিয়ারে উন্নতি জন্য আপনাকে একটা সাহসী পদক্ষেপ নিতে হয়। কোন কোন পজিশন কিন্তু একটা সময় গিয়ে থেমে যায়।ক্যারিয়ারে কিন্তু আপস এন্ড ডাউন থাকে। যদিও একটা সময়ে এমন পরিস্থিতিও কেটে যায়। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, আমার একটু পরিবর্তন প্রয়োজন ছিলো। আর ঐ মূহুর্তেই আমার কাছে ভালো একটা সুযোগ আসে ইন্দোনেশিয়ান কোম্পানি মাইওরা ফুডস (কপিকো) থেকে। আমি সেখানে ন্যাশনাল সেলস ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করি। দুই বছর যাবৎ আমি কোম্পানিটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত ও পরিসর বৃদ্ধির দায়িত্বে নিয়োজিত থাকি। পরে আমি সেখান থেকে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের জেনারেল ম্যানাজার হিসেবে জয়েন করি। সেখানেও আমার নতুন অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। দেশের বাইরেও প্রাণ অনেক ভালো একটি প্রতিষ্ঠান। প্রাণের  ভাবমুর্তি বাংলাদেশের মানুষের কাছে  যতোটা তার চেয়ে দেশের বাহিরে অনেক বেশি। আমি জয়েন করার পর আমাকে কিছু ইন্টারন্যাশনাল এসাইনমেন্টে ইন্ডিয়া এবং মালয়েশিয়া পাঠানো হয়।

বাংলা : তাহলে আপনি নিয়মিতই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন?

আহসান পারভেজ : হ্যাঁ। আমি নিয়মিত নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি। প্রাণ আর এফ এলএ বেশি দিন কাজ করাতে পারিনি।  কারণ এর মধ্যেই আমার কাছে ভিনি কসমেটিক্স থেকে ডাক আসে। সেখানে আরো ভালো সুযোগ পাই। আরো নতুন চ্যালেঞ্জ আসে। বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড হিসেবে জয়েন করলেও আমার দায়িত্ব পরে বাংলাদেশের সাথে নেপালও যোগ করে দেয়া হয়।দুইটা দেশের হেড হিসেবে কাজ শুরু করি। এরপর দুই তিন মাসের মধ্যে তারা আমাকে মিয়ানমারের দায়িত্বও দেয়। ইতিমধ্যে দেড় বছর হয়ে গেছে আমি কাজ করছি এই প্রতিষ্ঠানে।

বাংলা : ভিনি কসমেটিক্স সম্পর্কে জানতে চাই ।

আহসান পারভেজ : ভিনি কসমেটিক্স এটি ইন্ডিয়ান প্রতিষ্ঠান।এর অনেকগুলো ব্র্যান্ডের মধ্যে ফগ (Fogg) পারফিউমটা অন্যতম। এছাড়াও অসাম (Ossum), হোয়াইট টোন (white tone), গ্লাম আপ (glam up) হচ্ছে আমাদের উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটি খুব বেশি পুরনো না। গত চার পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশসহ বিশ্বের আরও বিভিন্ন দেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে পারফিউম ক্যাটাগড়িতে ফগ (Fogg) নাম্বার ওয়ান পজিশনে আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে এর অবস্থান ভালো হওয়ায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি খুব শিগ্রই বাংলাদেশে এর ফ্যাক্টরি দেয়ার। আসা করছি প্রতিষ্ঠানটির আরো ভালো অবস্থান তৈরী হবে।

বাংলা : এবার একটু হালকা গল্প শুনতে চাই। জীবনে মজার একটি ঘটনা।

আহসান পারভেজ : খুলনায় থাকা অবস্থায় কোরবানির ঈদের কয়েকদিন আগে একবার বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম। পাশ দিয়ে একটা ছাগলের পাল যাচ্ছিলো। তো কয়েকজন বন্ধু সেখান থেকে একটা ছাগল সরিয়ে নিয়ে আসে। দুষ্টুমি করে কাজতো করে ফেলেছি কিন্তু ছাগল রাখবো কই। সনাতান (হিন্দু) ধর্মের এক বন্ধু ছিলো আমাদের। প্ল্যান করি তার বাসায় রাখার। কারণ সেখানে কেউ খোঁজ করবে না। যেমন চিন্তা তেমনি কাজ। কিন্তু পরদিন ঐ বন্ধু এসে বলে সে ছাগলটা রাখতে পারবে না। কারণ (হাহাহাহা) সারারাত ছাগলের ডাকে সে ঘুমাতে পারেনি। এখন বিষয়টা ছাগলের মালিককে বলতেও পারছি না। পরে আমরা ছাগলটাকে জবাই করে খেয়ে ফেলি। কিন্তু বিষয়টা আমার কাছে খুব মজার ছিলো। এখনো চিন্তা করলে খুব হাসি পায়।

বাংলা : তরুণদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

আহসান পারভেজ: আমি যদি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলি, আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাংলা মিডিয়ামে পড়াশুনা করেছি। আমি পড়াশুনায় খুব একটা ভালো ছিলাম না। আমার রেজাল্টও খুব একটা ভালো ছিলো বলবো না। আমি প্রাইভেটে পড়াশুনা করেছি। কিন্তু আমার মধ্যে ইচ্ছাশক্তি ছিলো। কমিটমেন্ট ছিলো। যেমন আমি নয় বছর নেসলেতে কাজ করেছি। সেখানে আমি কমিটমেন্ট নিয়ে কাজ করেছি। এর মধ্যে কিন্তু আমি অনেক সুযোগ পেয়েছি। আমি কিন্তু ছেড়ে যাইনি। একটা সময় পর্যন্ত আমি ছিলাম এক জায়গায় থেকে মন দিয়ে কাজ করেছি। আমার মতে প্রফেশনালিজমে পরে আসা উচিত। আগে নিজের মধ্যে কমিটমেন্ট থাকা উচিত। আমি যদি প্রতিষ্ঠানকে কিছু দিতে পারি প্রতিষ্ঠানও আমাকে দিবে। একটা সময়ে আজকের যে যুবসমাজ, তরুণরা যারা ভালো জায়গা থেকে পড়াশুনা করে আসছে; জয়েন করার এক দুই বছরের মধ্যে তাদের মধ্যে চিন্তা চলে আসে। তারা প্রমোশন নিয়ে ভাবতে শুরু করে দেয়। আমি মনে করি যারা এই ধরনের ভাবে তাদের এই ভাবনা থেকে ফিরে আসা উচিত। কারণ আপনি আগে প্রতিষ্ঠানকে ভালো কিছু দিন, প্রতিষ্ঠানও আপনাকে নিয়ে ভাববে। অল্পতেই উতলা হলে চলবে না। তার মতে তরুণদের মধ্যে কয়েকটা ব্যাপার থাকতেই হবে। কমিটমেন্ট, সততা, প্রায়োরিটি, লক্ষ্য ঠিক রাখতে হবে। এক সাথে অনেক কিছু চিন্তা রাখা যাবে না।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0227 seconds.