• ০৮ অক্টোবর ২০১৭ ০৯:৫৯:১০
  • ০৮ অক্টোবর ২০১৭ ১৩:০৫:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

সুবোধ, কবে হবে ভোর?

ছবি: সংগৃহীত


হারুন-অর-রশিদ


‘আজব লাগে! দেশের একটা সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ফর্ম উঠিয়ে উনিশ কোটি চব্বিশ লাখ টাকা কামিয়ে ফেলছে; আর এই ইস্যুরে সেন্টার করে আপনারা একেকজন বলছেন, "রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বিলগেটস ইউনিভার্সিটি", "সর্বোচ্চ ফর্ম বিক্রির রেকর্ড", হ্যান ত্যান!

কোনো আইডিয়া আছে ভাই আপনাদের, এই উচ্চ মূল্যের ফর্ম বাণিজ্যের জন্য কত দরিদ্র ঘরের মেধাবী সন্তানেরা ইচ্ছে সত্ত্বেও একটা ইউনিটের বেশি ফর্ম তুলতে পারেনি? ... আমরা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার পরিবর্তে সেটার প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি! লজ্জা থাকা উচিৎ আমাদের। দিনশেষে আসলে একটা সিজিওয়ালা সার্টিফিকেট ছাড়া আর পাওয়ার কিছু নাই এখান থেকে।’

কথাগুলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থীর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তার ফেইসবুক পেজে লেখা। হঠাৎ করেই চোখ আটকে যায় তার লেখনিতে। ভাবায়। পীড়া দেয় সত্যিই তো, আমাদের লজ্জা থাকা উচিত। আমরা প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছি। হারিয়ে ফেলেছি ন্যায়-অন্যায় বিচারবোধ। মেনে নিতে শিখেছি শোষণ। দীর্ঘদিনের এই দমন পীড়নে হয়ে গেছি দাস। মানবিক সমাজের কীট। 

সেই লজ্জা থেকেই কথাগুলো চিন্তা করলে মনে হবে তার লেখনীতে প্রতিবাদের বারুদ দাউদাউ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। প্রতিবাদ বলছি এজন্য, আমাদের বেড়ে ওঠার যে সংস্কৃতি তাতে করে বিবেকে তাড়িত হওয়া আবেগ-অনুভূতি (প্রতিবাদ হোক আর অন্যকিছু) প্রকাশের একমাত্র পথ এই গণমাধ্যম। হাতের নাগালে বলেই কি না। যোগাযোগ মাধ্যমকে ঘিরেই আমাদের টোটাল সংস্কৃতি! কেননা এই সংস্কৃতিতে যুব সমাজ হারিয়ে ফেলছে প্রতিবাদের শক্তি, ন্যায়/অন্যায় বোঝার ক্ষমতা। ভুলে যাচ্ছে প্রতিবাদ করতে। তাই ভরসা কেবল ফেইসবুক! সেই সময় তো আর নেই, যখন প্রতিবাদগুলো জড় হয়ে আন্দোলনে রূপ নিত, ঘটত বিপ্লব। প্রতিবাদের শক্তি হারিয়ে ফেলার অন্যতম কারণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দায়ী করা যেতে পারে। আমাদের যত সমস্ত রাগ-ক্ষোভ-প্রতিবাদ ক্ষণিকের জন্য হলেও যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে (স্ট্যাটাস দিয়ে) প্রশান্তি পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করি। সংস্কৃতি হয়ে পড়েছে গণমাধ্যম কেন্দ্রিক, আমরা আত্মকেন্দ্রিক আর সমাজ ... ! যার ফলে কালে কালে যে বিদ্রোহ-প্রতিবাদ বিপ্লবে পরিণত হয়েছিল আজ তা ইতিহাস মাত্র।  

বলা যেতেই পারে ওই শিক্ষার্থীর প্রতিবাদ তার একার নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ‘সচেতন শিক্ষার্থী’র। সচেতন শব্দটা এজন্য ব্যবহার করছি, একটা মেধাভিত্তিক যুদ্ধের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় অর্জন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা শিক্ষার্থীই মেধাবী। প্রশ্ন তবে সব শিক্ষার্থী প্রতিবাদ করে না কেন নাকি করতেই জানে না। এটা স্পষ্ট, একমাত্র সচেতন শিক্ষার্থীরাই পারে প্রতিবাদ করতে।

খবর হল ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক শ্রেণিতে অনুষ্ঠিতব্য ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিক্রি করে ‘১৯ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার চারশো টাকা কামিয়েছে। কোটাসহ মোট চার হাজার সাতশো ১৩টি আসনের বিপরীতে তিন লাখ ১৬ হাজার একশো ২০ জন ভর্তিচ্ছু আবেদন করায় প্রতি আসনের বিপরীতে অংশ নেবে প্রায় ৬৭/৬৮ জন। গত সেশনে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ না থাকলেও এবার তা পুনরায় চালু করা হয়েছে। এর আগে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে এক লাখ ৭৮ হাজার ৯৪৮, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে এক লাখ ৬০ হাজার ৬৮২, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে এক লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৪টি আবেদন জমা পড়েছিল।’

একটু নিজের কথা বলে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার স্বপ্ন দেখতাম অনেক ছোট থেকেই। স্বপ্নটা মূলত বাবার। কলেজের গণ্ডি পাড়ি দিয়ে গেলাম কোচিং করতে। কিছু দিন যেতেই ফিরতে হল। কেন ফিরতে হল তা আলাপেই বেরিয়ে আসবে। প্রথমবার চান্স পেলাম না। তবে হেওে যাইনি। মধ্যবিত্তরা জানে তাদের স্বপ্ন কীভাবে পূরণ করতে হয়। ফের শুরু করলাম পড়াশোনা। নিজে নিজেই। পরীক্ষা আসন্ন। ভয় পেলাম। যদি এবারও চান্স না পাই! বন্ধুর মাধ্যমে এক বড় ভাইয়ের প্রাইভেট ব্যাচে যোগ দিলাম। মাত্র তিন হাজার টাকায় মাস কয়েক পড়লাম। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল যখন ভর্তির ফরম উঠাব। বাপরে, এত টাকা কোথা থেকে আসবে? যা ছিল তা তো আগেই শেষ। অনেক কষ্টে খেতে না পেরেও বাবা টাকা ব্যবস্থা করলেন (সুদের টাকা)। নিরুপায়। কারণ পরীক্ষা তো দিতে হবে। ফরম তুললাম মাত্র দুইটা। অতো টাকা তো আর নেই যে বেশি সংখ্যক ফরম উঠাব। পরীক্ষা দিলাম। চান্সটাও পেলাম। ক্ষণিকের জ্বালা মিটেছে হয়ত। তবে এখনো গহীনে লেগে আছে পুরনো দাগ। ব্যথায় কাটা দিয়ে আসে যখন শুনি আমার মত অন্য কারো গল্প। দুইটা ফরম (মূল্য ১৫শো প্লাস) তুলতে সুদের টাকা নিতে হয়েছে। 

যাহোক, খবরটাকে ওই শিক্ষার্থীর কথাগুলোর মাধ্যমে আলাপ করা যাক। আজব লাগে! হ্যাঁ, আজব লাগে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কাণ্ডে আজব লাগারই কথা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি টাকা কামানোটা চমকে দেওয়ার মতই। বলা যেতেই পারে, ভর্তি প্রক্রিয়ার নামে ইহা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টাকা কামানো’র প্রক্রিয়া নিশ্চয়। যেখানে ক্রমাগত ফি বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক কোর্স, ইউজিসির ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা ইত্যাদি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক আবাসস্থল, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এই আগ্রাসনের ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাকে করে তোলা হয়েছে পণ্য; সেখানে কতিপয় সংবাদকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়কে বিল গেটস উপাধি দিয়ে দিলেন! বাহ। 

তাদের কাছে প্রশ্ন রাখছি, বিল গেটস কে বা কারা, কীসের নাম? শুধুই কি একজন ব্যক্তি। আসলে বিল গেটস একটি সিস্টেম। একটি কাঠামো। শোষণের সর্বোচ্চ রূপ। রক্ত চোষক। সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে যারা গড়ে তোলে সম্পদের পাহাড়। যেখানে মানুষ মাত্রই পণ্য। সাধারণ মানুষের শ্রমকে উপজীব্য করে জন্ম নেয় বিল গেটসরা। যার স্বীকৃত রূপ পুঁজিবাদ। তার ওপর কথা হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। প্রাইভেট আর পাবলিকের এই তফাৎ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর কিছু নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তো টাকা কামানোর কারখানা নয় নিশ্চয়। তাই ফরম বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামানোর কোনো মানে হয় না। এত টাকা কোথায় যাবে? কোন খাতে ব্যয় করা হবে? কে কত পাবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন উন্নতি হবে এই টাকায় কিংবা এই টাকার উৎস কোথায়? হাজারও প্রশ্ন, এসব নিয়ে আমাদের ভাবাটা উচিত ছিল বৈকি।

হয়ত নিজের মধ্যে দিয়ে উপলব্ধির চেষ্টা করি, তৃতীয় বিশে^র একটি দেশে কত ‘দরিদ্র’ মেধাবী অকালে ঝরে যায়। পুঁজি-কাঠামোতে থেকেও সামান্য টাকার অভাবে স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। পারে না বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে। শিক্ষক-সমাজ কি পারেন না এই উচ্চমূল্য শিথিল করতে। মেধাবীদের মেধা বিকাশের পথ প্রশস্ত করে দিতে। হয়তো রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রে সেগুলো করা বেশ ঝুঁকি, তবে সেই স্বাধীনতা তো আপনাদের আছে। কিন্তু আপনারা পারলেও তা করেন না। আসলে শিক্ষকতার এই মহান পেশায় ঢুকে ‘শিক্ষক-সত্তা’কে ভুলে না গেলেই কি নয়? আত্ম-সম্মানবোধটা ধরে রাখা কি খুব কষ্টের? হায়! কতো সহজে ভুলে গেলেন, আপনার পড়াশোনাটাও চলেছে এই কুলি-মজুর-শ্রমিকের টাকায়। 

আসলে যে শিক্ষা শিক্ষার্থীদের ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার অন্তরায়, সে শিক্ষা এ সমাজ চায় না। চায় না পুঁজিবাদী কাঠামো। বিশ্ববিদ্যালয় যদি কাউকে মানবিক করে তুলতে না-ই পারে, তবে কি এগুলো থাকা আবশ্যক? যেখানে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা আগামী দিনে টাকা কামানো মেশিনে রূপ নিবে, মানবসত্তাকে বিসর্জন দিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠবে নিজেকে বিল গেটসের আসনে আসীন করার প্রচেষ্টায়। বাংলাদেশ কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্র নয়। এদেশে ইঞ্জিনিয়ার অপেক্ষা মেকার শ্রেয়। বাংলাদেশ চায় মানবিক সমাজ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন নৈতিক দায়িত্ব পালন করা, মানবিক সমাজকে কিছু দেওয়া। সবার একটু একটু চাওয়াই পারে বাণিজ্যিকীকরণের হাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাকে রক্ষা করতে। নতুবা গলা মেলাতে হবে, ‘শূন্যতায় ডুবে গেছি আমি, আমাকে ফিরিয়ে নাও। থাকতে হবে সেই গডো’র অপেক্ষায়। কবে আসবে গডো, উদ্ধার করবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে। আশায় থাকি-সুবোধ, কবে হবে ভোর? 

লেখক : সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0179 seconds.