• ৩১ আগস্ট ২০১৭ ১৪:৪৪:৪১
  • ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ২০:০১:১৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

এই গল্প নিষিদ্ধ হোক

ঘটনা হলো পাশের বাসায় কোরবানির গরু কেনা হয়েছে। গরুটি কিনেছে টগরের বাবা। সেই গরুকে ঘিরে টগরের আনন্দের শেষ নেই। পাতা, ঘাস, খড়কুটো গরুটিকে ছুড়ে মেরে খেতে দেয়। গরুটা দু'একটা খড়-পাতা মুখে দিলেই টগর হাততালি দিয়ে উল্লাস করে। এই দেখে তনয়ও একটি পাতা খাওয়াতে যায়। তখন টগর তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলে ছুটে আসে তন্নী। সে টগরকে শাসিয়ে বলে আসে তার বাবা আরো বড় গরু কিনে আনবে আজ। তখন তারা সারাদিন পৃথিবীর সব ঘাস এনে গুরুটিকে খাওয়াবে। ভাইয়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরে আসে তন্নী। তনয়ের মুখ যথারীতি গম্ভীর। মাত্র ৫ বছর বয়স, কিন্তু বেশ গম্ভীর হয়ে উঠছে ছেলেটির স্বভাব।

তন্নী বাসায় ফিরেই মায়ের কাছে জানতে চায় তাদের গরু কবে কিনবে। কাজের ফাঁকেই সাদিয়া জামান সন্তানদের আশস্ত করে বলেন, ঈদের এখনো ৩ দিন বাকি। এর মাঝেই গরু কেনা হবে। রাতে আফসার উদ্দিন বাড়ি ফিরতেই গম্ভীর তনয় এবার মুখ খুললো। বাবা গরু কবে কিনবে? আফসার উদ্দিন হেসে বলেন কাল  কিনবো বাবা। মধ্যবিত্ত পরিবারে আগামীকাল শব্দটি’ একটি কালপ্রিট প্রতারণা মূলক শব্দ মনে হয়। যদিও ‘আগামীকাল’ উচ্চারণ করেই বেঁচে থাকতে হবে তাদের।

এবার আমরা যাবো আফসার উদ্দিনের অফিসে। অফিসে বসে আছে আফসার উদ্দিন। চিন্তিত। দু মাসের বেতন বকেয়া আছে। এবার বোনাস মিলবে না আগেই জানানো হয়েছে। তবে ঈদের আগেই বকেয়া বেতন পরিশোধ করার কথা। কিন্তু কারখানার মালিকপক্ষের লোকজন লোকসানের কথা শোনাচ্ছে। অথচ গতকালই বলেছিলো আজ বেতন হবে। মানে গতকালকে এই আজ শব্দটি উপস্থাপন হয় ‘আগামিকাল’ হয়ে। আফসার উদ্দিন কিছুই ভাবতে পারছে না। কিভাবে সংসার চালাবেন। ঈদের বাকি আর ১ দিন। ছোট ছেলে-মেয়ে দুটোকে কিইবা বলবেন। অফিস জুড়ে গুমোট পরিবেশ কেউ কথা বলছে না।

মধ্যবিত্তের জন্য আশা নামক একটি যাদুকরী শব্দ আছে। সেই শব্দ ধরে এগিয়ে যায় আফসার উদ্দিন। ঈদের আগের দিনও অফিসে পৌঁছে আফসার উদ্দিন আশা নিরাশার স্বপ্ন ও উৎকণ্ঠায় ঝুলছে। সেই শব্দ ধরেই তার স্ত্রী সন্তানদের বলছে আজ রাতেই বাবা গরু নিয়ে আসবে। সেই যাদু শব্দের গুনেই ছোট ছেলে মেয়ে দুটি তখনও তর্ক করে যাচ্ছে প্রতিবেশি বন্ধুদের সাথে। যদিও আফসার উদ্দিন বেতন পাবে না। কারখানার অনেক লসে আছে। মালিক হিমশিম খাচ্ছে। যদিও মালিকের সন্তানেরা ঈদ উপলক্ষে দেশের বাইরে ট্যুরে যায় সময় কাটাতে। যদিও মালিকের স্ত্রী বিরক্ত তাদের কোরবানির জন্য কেনা উট ও দুম্বার পার্থক্য নিয়ে। যদিও মালিক সংশয়ে ছিলেন হরিণ কোরবানি যায়েজ হবে কিনা এ নিয়ে...।

এদিকে জানালা ধরে দাড়িয়ে আছে তন্নী আর তনয়। বিকেল গড়িয়ে রাত, তারা অপেক্ষা করছে তাদের বাবা ইয়া বড় গরু নিয়ে ফিরবে। তাদের মা আজ অহেতুক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। যে রুমেই সন্তান দুটো থাকে সে অহেতুক কাজ নিয়ে অন্য রুমে চলে যাবে। তার চোখ লাল হয়ে উঠলে পানি গড়িয়ে পরার আগেই বার বার বাথরুমে গিয়ে তাকে মুখ ধুতে হবে।

এক সময় জানালা থেকে দেখা যায় আফসার উদ্দিন ফিরছে। তন্নী-তনয় অবাক হযে দেখে বাবার সাথে গরু নেই খালি হাতে ফিরছে। তারা ভাবে এটা বোধ হয় বাবা না। বাবা তো গরু নিয়ে ফিরবে। এটা নিশ্চই বাবার মতো দেখতে অন্য কেউ। কিন্তু তাদের ভাবনা ভুল প্রমাণিত করে আমরা দেখতে পাই, খালি হাতেই আফসার উদ্দিন ঘরে ফেরে। দরজা খুলতেই তন্নী প্রশ্ন করে বাবা গরু কই? আফসার উদ্দিন বলে- মা গরুটি পথ থেকে হারিয়ে গেছে...।

রাতে আফসার উদ্দিন তন্নী তনয়কে দৈত্য-দানোর গল্প শুনায়। রাজা রানীর গল্প শোনায়। রুপকথার সমস্ত ঝুলি আজ আফসার উদ্দিন ঢেলে দিতে চায় সন্তানদের সামনে। যদিও রাজা, রাজকন্যাদের গল্পের ফাঁকেই তনয় প্রশ্ন করে- আচ্ছা বাবা গরুটিতো হারিয়ে গেছে ওদের মা বাবা কি এখন ওকে খুঁজছে? একটু থেমে আবার প্রশ্ন করে বাবা গরুটি কি অনেক বড় ছিলো? আমরা দেখতে পাবো এবার আফসার উদ্দিনকেও বাথরুমে যেতে হবে। তার চোখ কেমন লাল হয়ে উঠেছে...। বিব্রত আফসার উদ্দিন স্ত্রিকে বলে বেতন পেলে চোখের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। মাঝে মাঝেই কেমন চোখ লাল হয়ে জ্বালা পোড়া করে, পানি বের হয়ে আসে।

এই পরিবার থেকে বের হলেই আমরা আবার উৎসবে সামিল হতে পারবো। অসংখ্য মানুষের উৎসব আর নিয়ন আলোয় নিজেদের সাজাতে পারবো। এই উৎসবের দিনে আফসার উদ্দিনের গল্পকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানাই। এই গল্প নিষিদ্ধ হোক...।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কোরবানি গরু গল্প

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0399 seconds.