• ২৮ আগস্ট ২০১৭ ১৩:৩৪:৫৫
  • ২৮ আগস্ট ২০১৭ ১৪:২৫:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
সংশ্লিষ্ট ঘেন্না

পর্ব-১

দংশন


মিমি হোসেন


যান্ত্রিক একটা ঘষঘষে শব্দ থেমে থেমে রিদমিকভাবে মাথায় বাড়ি দিয়ে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলো রাফির। কপালের দুপাশে খুব ভারী কিছু দিয়ে চেপে আছে যেনো, একটা ভোঁতা ভাব, সাথে চোয়াল আটকে আছে এমন অনুভূতি। খুব কষ্টে চোখ মেলে তাকালো সে। রুমের ভেতরে একটা দম আটকে দেয়া ভ্যাপসা ভাব বিরাজ করছে। বমি বমি লাগছে রাফির।

শব্দটা একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর ইঞ্জিন স্টার্ট দেবার মত করে আবার একঘেয়ে ভাবে আওয়াজ করেই যাচ্ছে যেনো।

প্রতিদিন চোখ মেলে কিছুক্ষণ নিজের হৃদস্পন্দন শোনে সে, এর পর কয়েক সেকেন্ড লেগে যায় শব্দটি উৎস অনুধাবন করতে। রোজ সে ভাবে আলীম মিয়াঁ কে বলতে হবে এসির লোক ডাকতে। এসি মেরামত করার প্রয়োজনীয়তা রাফি প্রতিদিন ঠিক এই সময়টিতেই অনুভব করে।

প্রচণ্ড তেষ্টায় বুক গলা যেনো শুকিয়ে  শিরিষ কাগজ হয়ে আছে, জিভের ভেতর এক দলা তিতকুটে ভাব ছড়িয়ে পুরো মুখ বিস্বাদ হয়ে আছে তার। হাত বাড়িয়ে সেগুন কাঠের বেডসাইড টেবিল থেকে লাইটার আর মার্লবোরোর প্যাকেটটা হাতে নিলো সে। প্যাকেট খুলে কিছুক্ষণ চুপ করে কি ভাবল তারপর আবার নামিয়ে রাখল বিছানার এক কোনে।

সেল ফোন হাতে নিয়ে ওয়াইফাই অন করতেই ক্রিং ট্রিং টুট করে নানা টোনে মেসেঞ্জার আর ভাইবার তাদের উপস্থিতি জানান দিলো। একবার চোখ বুলিয়ে নামিয়ে রাখল আবার।

বাবা যতদিন ছিলেন বাড়িতে এসব বাড়াবাড়ি রকমের ব্যবস্থা রাখেনি রাফি, শুধু তার শোবার ঘরের মিনি রেফ্রিজারেটরটা সে আগলে রেখেছে পরম মমতায়, যেমনটি করে সেফটি লকার আগলে রাখে কেও। কি নেই এর ভেতর! 

কার্লসবার্গ হেইনকেন থেকে শুরু করে পাসপোর্ট জ্যাক ড্যানিয়েল ভ্যাট সিক্সটিনাইন সবই আছে। এই ব্যাপারে তার সৌখিনতা এখন চেপে রাখার পর্যায়ে নেই আর।

বিদেশ বিভুঁইয়ে যে বন্ধুরা আছে আসবার সময় কারো হাতে আর কিছু না থাকুক রাফির পছন্দের লেবেল থাকে নি:স্বন্দেহে। যদিও বাসায় খুব নিয়মিত সে এগুলো বের করে না। তার নিজস্ব কিছু নিয়ম সে মেনে চলার চেষ্টা করে। এম্নিতেই সপ্তাহে দু তিন দফা শ্যেলে লা ডিপ্লোমাটা গ্যালাক্সির মত বিভিন্ন জায়গায় তার যেতে হয়, আগে বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিতে যেতো এখন নিজেই ডেকে নেয় সবাইকে। মা বুঝতে পারেন, বলেন না কিছুই। একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে যায় তার বুক থেকে।

ফ্রিজ খুলে একটা ঠান্ডাপানির বোতল বের করলো রাফি, এক ঢোকে প্রায় অর্ধেকটা শেষ করল সে। পানিভরা বোতলটা কপালে চেপে ধরলো কিছুক্ষণ। গতকাল রাতের কথা মনে হতেই বিস্বাদে ছেয়ে গেলো মন তার।

মেয়েটা কেমন আছে কে জানে! নাম ছাড়া খুব বেশি কিছুই সে জানতে পারেনি মেয়েটার। আর জানার চেষ্টা করাটাও বোকামি হবে, এটাও খুব সত্যি। কাল রাতের ঘটনায় অনুতাপ ছাড়া তার আরকি করার ছিলো! হয়ত
ছিলো।

রাজীব ভাইয়ের ডাক সে আজ অবধি ফেরাতে পারেনি, আসলে সে নিজেই চায়নি এমন আমন্ত্রণ গুলো উপেক্ষা করতে কখনো, বরং ওই যে বলে "খানে ওয়ালোকো খানেকা বাহানা চাহিয়ে!" রাফির ক্ষেত্রে শব্দটা হবে "পিনে ওয়ালোকো"। গতকাল রাতে ঠিক তেমনি এক আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলো সে। রাজীব ভাই তার ব্যবসায়িক রাজনৈতিক আর বন্ধুমহলের খুব কাছের কিছু মানুষকে নিয়ে একটা ওভার নাইট পার্টি থ্রো করেছিলেন। যদিও এসব পার্টি খুব বেওয়ারিশ ধরনের হয় রাফির জানা আছে। সদর দরজা দিয়ে জোড়ায় জোড়ায় আসবে দেখলে মনে হবে এরা একইসাথে, কিছুক্ষণ বাদে লুডুর ঘুটির মতো যেনো ঝাঁকি দিয়ে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে বলা হয়, বেছে নাও! সব রাফির অন্তরস্থ। যেখানেই যায় একা যায় এতেই সে অভ্যস্ত। আজ অনেকদিন বাদে তার ভার্সিটির এক ছোট ভাই যে আমন্ত্রিত সকালে ফোনে জানায় তার সাথে আসতে চাচ্ছে। রাফি খুশি হয়েই তাকে নিয়ে এসেছে আজ।

এসব ব্যাপারে রাফি খুব স্পর্শকাতর, সে নিজের মত উপভোগ করতে ভালোবাসে। আজকের জায়গাটি তার খুব একটা পছন্দ হয়নি, পুরোনো ঢাকার এই অংশটিকে রাজীব ভাই কেন বেছে নিয়েছিলেন তা রাফির জানা নেই, হয়ত রাজনৈতিক কোনো ইস্যু নিয়ে তার আজকের এই ব্যবস্থা।

রাত দেড়টা কি দুটা হবে হোয়াইট এন্ড ম্যেকের পেগটা হাতে নিয়ে ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়েছে সে সবে, ফোনটা বেজে উঠল। নাফিদ, সাথে আসা ছোট ভাইটার নাম্বার দেখে একটু অবাক হলো সে..

-- হ্যালো, নাফিদ!  কিরে ব্যাটা তুই আবার ফোন দিলি কোত্থেকে!
-- রাফি ভাই একটু নীচে আসেন ভাই, খুব দরকার। প্লিজ ভাই।
-- ওকে আসছি।
নীচে নেমে কাউকে না পেয়ে সে আবার নাফিদকে ফোন দিলো।
-- নাফিদ কই তুই?
-- ভাই গেটের বাইরে আসেন, আমি বাইরেই আছি।
-- ওকে।

গেটের বাইরে ৬ জন পুলিশ কন্সটেবল, নাফিদ আর বিশ বাইশ বছরের একটি মেয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে। 

রাফি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নাফিদের দিকে তাকাতে নাফিদ যা বলল তাতে রাফি বুঝে গেলো যে আজ রাতের মত বাতাসে নিজেকে বিসর্জন দেয়ার এখানেই সমাপ্তি। ভালো ঝামেলায় পড়া গেলো এবার।

-- ভাই, নীরা আমার পরিচিতা খুব বিপদে পড়েছে আপনি কি কিছু করতে পারেন! 
-- কি বিপদ! খুলে বল।
-- সে আমার এক্স কলিগ, খুব একটা যোগাযোগ ছিলো না এতদিন। আজ আমিও তাকে এখানে এই অবস্থায় দেখে অনেক অবাক হয়েছি ভাই।

আমাদের কথার ঠিক মাঝখানেই পুলিশ কন্সটেবলরা বলে উঠলো
-- আরে ভাই এই সব ভগিচগি বাদ দেন। আমাদের কাজ আমাদের করতে দেন, এই সব ভদ্রগল্প এইখানে মানাইতেছে না। আপনারা বাড়ি যান আমাদেরকে ইনারে নিয়ে যাইতে দেন। 

নাফিদ আর সে কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা পুলিশের জীপ এসে তাদের সামনে দাঁড়ালো।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

দংশন গল্প মিমি হোসেন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0207 seconds.