• ২০ জুলাই ২০১৭ ১৮:৫৮:২৪
  • ২০ জুলাই ২০১৭ ১৯:৩৩:০৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মিসির আলির লাইটার

.


আসাদুজ্জামান আসাদ


যতখানি উত্তেজিত হয়ে দরজায় কড়া নাড়লো হিমু, তার চেয়ে অনেক বেশি শান্ত হয়ে দরজা খুললেন মিসির আলি। দরজা খুলেই একবার হিমুর চোখেমুখে আর একবার তার পায়ের দিকে তাকিয়ে ফিরে গেলেন নিজের রান্নাঘরে। 

"স্যার, আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে, এক্ষুণি।" -হিমুর তাড়া।

"তোমার কাছে লাইটার আছে হিমু? আমি প্রচন্ড বিরক্ত নিজের ওপর। আজ সারাদিনে দুইবার লাইটার কিনতে বের হয়েছি, কিন্তু দোকানে গিয়ে মনে করতে পারিনি কী কেনা দরকার?" -মিসির আলি বিরক্তি নিয়েই বললেন।

-স্যার, আপনি জানেন আমার কাছে লাইটার নেই, আমার হাতে ব্যাগ নেই, পকেট নেই, তারপরও সান্ত্বনা খুঁজতে প্রশ্ন করলেন...। প্লিজ স্যার, আরেকটা কাজ করুন, আমার সাথে চলুন। বৃষ্টি শেষ হবার আগেই চলুন। আমরা লাইটার কিনে ফিরবো। সান্ত্বনার জন্য হলেও কিছু কাজ এমনি এমনি করা যায়।

-শোনো হিমু, তুমি যা বলছো তা আমি বিশ্বাস করি না। চোখে দেখলেও না। তাই যাবার প্রশ্নই আসে না। তোমাকে দ্বিতীয়বার পাঠালাম ঠিকমত দেখতে, আমার ধারনা তুমি না দেখেই চলে এসেছো। কারণ প্রথমবার তোমার পায়ে কাদা ছিল, এখন পরিষ্কার। 

-আপনার বাসা থেকে সাড়ে সাতচল্লিশ কদম দূরে রাস্তার মধ্যে গর্তে পানি জমেছে, সেখানে পা ধুয়েছি। পা ধোয়ার সময় ঠিকাদারকে মনে মনে ধন্যবাদ দিয়েছি। ব্যাটা কাজে গাফিলতি না করলে রাস্তায় পানি জমতো না, আমার পা ধোয়া হতো না। ইদানিং এরা ব্রিজ তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ দিচ্ছে। দেশের বাঁশ শিল্প এগিয়ে নিতে এরা সচেষ্ট।

-হিমু চলো, আমার লাইটার বা ম্যাচ কিছু একটা কিনতে হবে। এত রাতে দোকান খোলা পাওয়ার সম্ভাবনা কম যদিও।

২.

বের হয়ে পড়লেন হিমু আর মিসির আলি। রাত বেশ গভীর। ভেজা রাস্তা। একটু আগেই "মেঘের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে বৃষ্টি" ধরনের বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আকাশ দেখে বোঝার উপায় নাই। বেশ আলোকিত। মেঘ কেটে গিয়ে বৃষ্টির মতই অঝোর ধারায় ঝরছে জোসনা। সেই জোসনায় নিঃশব্দে হেঁটে চলেছে দুই মেরুর দুজন মানুষ। লজিক আর এন্টিলজিকের দুই বাহক।

বেশ কিছুদূর হাঁটার পরই একটা ফাঁকা মাঠের মত জায়গায় চলে আসলেন তারা। হিমু হাতের ইশারায় মিসির আলিকে দেখিয়ে দিলেন একজন মানুষ পেছনে হাত বেঁধে ফাঁকা মাঠের মধ্যে পায়চারি করছে আর কি যেন বিড়বিড় করছে। চোখে চশমা। গায়ের পাঞ্জাবিটা ভেজা, জোসনার আলোতে চকচক করছে।

মানুষটাকে দেখেই চমকে উঠলেন মিসির আলি। নিজেকে সামলে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। 

"ভালো আছেন মিসির আলি সাহেব? দোকান খোলা পেলেন? আপনি নাকি বিশ্বাস করতে চাচ্ছিলেন না আমি আজো বৃষ্টিতে ভিজি, জোছনায় হাঁটি? আমার না থাকা মানে কিন্তু আপনার এক্সিসটেন্সকেও অস্বীকার করা। নিন সিগারেট ধরান।"

মিসির আলির দিকে সিগারেট এগিয়ে দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলেন তিনি। তিনি অন্যমনস্ক, অনেকটা ধ্যান করার মত করে হাঁটছেন। দুজন মানুষ তাঁর পাশে আছে সেদিকে খেয়াল নেই তার।

সিগারেট খেয়ে কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন মিসির আলি। বৃষ্টির কারণে যদিও একটু ড্যাম্প!

৩.

বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলেন মিসির আলি। পেছনে হিমু। বাসায় ঢোকার পর চোখেমুখে পানি দিয়ে ইজিচেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে জিগ্যেস করলেন, হিমু তুমি কি আজকের রাত এখানেই কাটাবে?

-আমি চলে যাবো স্যার। ব্যাখ্যা দিন যা দেখলেন তার।

-হিমু, প্যারাসাইকোলজি বোঝো হয়ত তুমি। প্যারাসাইকোলজি হলো অনেকটা ব্যাখ্যাহীন মানসিক বিষয়। টেলিপ্যাথি,  সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার, হেলুসিনেশান, মেন্টাল ইন্টারফেস কানেক্টিভিটি, ফ্যান্টাসি অব সাবকনসাস সবই প্যারাসাইকোলজির বিষয়। তোমার ফ্যান্টাসি অব সাবকনসাসের অভিজ্ঞতা থাকার কথা, সব পুরুষ বা মহিলাদেরই হয়। জানো তো? 

-স্যার, আজ সেটা ঘটেনি।

-হ্যাঁ হিমু, আজ সেটা ঘটেনি। আজ প্যারাসাইকোলজির গবেষণার দু’তিনটা উদাহরণ আমরা একসাথে দেখেছি। হেলুসিনেশান আর মেন্টাল ইন্টারফেস কানেক্টিভিটি একসাথে ঘটেছে। তুমি এলোন মাস্কের নাম শুনেছো? ইনি মানুষের ব্রেইনে ওয়্যারলেস ডিভাইস বসিয়ে বাহিরে থেকে কনট্রোলের কাজ অনেকখানি এগিয়ে নিয়েছেন বলে ঘোষনা দিয়েছেন। নিউরোলিংক বলে একে। মানুষের সাথে মানুষের এরকম কিছু নিউরোলিংক প্রকৃতি দিয়ে দিয়েছে। এটা যখন হয় তখন সেটাকে আমরা টেলিপ্যাথি বলি আবার কিছু ঘটনা একই রকম করে ঘটতে থাকে। যেমন ধরো, গবেষনায় দেখা গেছে, একটা লেডিস হোস্টেলের মেয়েদের মাসিকের তারিখ কয়েক বছর পর প্রায় কাছাকাছি হয় যদিও শুরুতে যখন তারা হোস্টেলে উঠেছিল তখন আলাদা তারিখ হয়েছিল। এটাই কানেক্টিভিটি।

-তারপর? 

-বিষয়টা শুধু সাইকোলোজিকাল নয়, ভিজ্যুয়ালও হতে পারে। তোমাকে আরেকটা উদাহরন দেই। কয়েকবছর আগে চাঁদে দেলোয়ার হোসেন সাঈদিকে চাঁদে দেখার একটা গুজব উঠেছিল তোমার মনে আছে? বেশ কিছু মানুষ মারা যায় তখন। তুমি কি বিশ্বাস করো চাঁদে সাঈদিকে দেখা সম্ভব?

-না। হিমুর উত্তর।

-হিমু, আমি যদি বলি সে রাতে চাঁদে সাঈদিকে দেখা গেছে তবে?

কিছুটা অবাক হলো হিমু।

-শোনো, চাঁদের গঠনটা এমন তুমি সেদিকে তাকিয়ে অনেক কিছু কল্পনা করতে পারবে। কিছু খারাপ মানুষ সাধারন মানুষকে বুঝিয়েছে চাঁদে সাঈদিকে দেখা গেছে। এটা সাধারন মানুষের মস্তিষ্কে ঢোকাতে পেরেছে তারা। ফলে, হাজার হাজার মানুষ একটা রং সিগন্যাল পেয়েছে এবং তাদের ব্রেইন সেটাকে সত্যি বলে এমনভাবে গ্রহন করেছে যে যে তারা সত্যি সাঈদিকে দেখতে পাচ্ছে। এটা কয়েক হাজার মানুষের সাথে ঘটলে তুমিও আমার সাথে  কেন করতে পারবে না! আর সাইকোলোজিকাল সুপার পাওয়ার তোমার আছে হিমু।

একটু থেমে আবার শুরু করলেন মিসির আলি। 

-হিমু। তুমি নিজে যাকে দেখেছো তিনি মৃত। তিনি জোছনা, বৃষ্টি ভালবাসতেন। আজকে বৃষ্টি হয়েছে। সাথে জোছনা ও । তোমার ব্রেইন হেলুসিনেশান তৈরি করেছে তাকে দেখিয়েছে তোমাকে। তোমার ব্রেইন মেন্টাল ইন্টারফেস কানেক্টিভিটির দ্বারা আমার ব্রেইনকেও কনভিনসড্ করেছিল। তাই আমিও দেখেছি। কিন্তু এটা পুরোটাই অবাস্তব। 

-স্যার, আপনি সিগারেট খেয়েছেন। আপনার কাছে না সিগারেট না লাইটার ছিলো।

-হুম। হিমু, হেলুসিনেশান বহু ধরনের হতে পারে। ভিজুয়াল বা দৃশ্যমান, গ্যসটেটরি বা স্বাদজনিত, সোমাটিক বা স্পর্শগত আবার গন্ধজনিত বা অলফ্যাক্টরি। আমার ব্রেইন প্রচুর পরিমানে নিকোটিন চাচ্ছিল। সিগারেটটাও এবং তার স্বাদ বা গন্ধ সবই বিভিন্ন ধরনের হেলুসিনেশান। হিমু, তুমি এবার যাও। 

৪.

হিমু বের হয়ে পড়ল। প্রায় ভোর। কাক ডাকা ভোর। হিমু হাঁটছে। মিসির আলি সাহেবের ব্যাখ্যায় মন খারাপ তার।  সে মানে না এসব। সে জানে, প্রকৃতির অনেক ক্ষমতা।

৫.

হিমু বের হবার পর, এটা নিয়ে তৃতীয় সিগারেট মিসির আলির আঙুলে। তিনি একটাতেও টান দেননি। আগুন দেবার পর আঙুলেই পুড়ে ছাই আগের দুটো। তিনি এই সিগারেটের আগুনের দিকে তাকিয়েও ব্যাখ্যা খুঁজছেন। লাইটারের ব্যাখ্যা। রাতে তিনি লাইটার কেনেননি, এটা সেই জোছনাপ্রেমী মানুষটার দেয়া লাইটার।প্রকৃতির অনেক ক্ষমতা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

হুমায়ুন আহমেদ মিসির আলি

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0245 seconds.